পদ্মাসেতুর ছোঁয়ায় বদলে যাওয়া অনন্য ভাঙ্গা

দেশের খবর ফিচার

মাহবুব হোসেন পিয়াল, ফরিদপুর : প্রতিদিন সকাল, বিকেল, সন্ধ্যা ও রাতে ফরিদপুরের ভাঙ্গা বিশ্বরোড মোড় গোলচত্বরকে ঘিরে বিভিন্ন বয়সের অসংখ্য নারী-পুরুষ ভিড় লেগে থাকে। করোনাকালীন ঈদসহ বিভিন্ন উৎসবেও থাকে উপচে পড়া ভিড়। দূর-দূরান্ত থেকে প্রতিনিয়ত এই চত্বর দেখতে আসে জেলা ও জেলার বাইরে থেকে অসংখ্য মানুষ।

নগরকান্দার রামনগর গ্রাম থেকে আগত কানাই মাতুব্বর (৭৫) বলেন, ‘এখানে উপরে রাস্তা, নিচে রাস্তা, চারপাশে রাস্তা। এ রকম রাস্তা জীবনেও দেখিনি। রাতে বাত্তি জ্বলে উঠলে মনে হয় বিদেশ আছি। আমাগো প্রধানমন্ত্রীরে ধন্যবাদ জানাই, শেষ বয়সেও এসেও দেশের এতো উন্নতি দেখবো ভাবতে পারি নাই।’

ভাঙ্গা বিশ্বরোড মোড় একসময় ছিল চারটি সড়কের সংযোগ স্থান। এখানে ছিল বাসস্টপেজ। সরকার পদ্মা সেতু নির্মাণ প্রকল্প হাতে নিলে পদ্মা সেতু থেকে ভাঙ্গা পর্যন্ত এক্সপ্রেসওয়ে নির্মাণ শুরু করেন। নতুন রুপ পেতে থাকে দক্ষিণাঞ্চলের একুশ জেলার প্রবেশদ্বার খ্যাত ভাঙ্গা বিশ্বরোড গোল চত্বর। ২০১৪ সালের নির্বাচনে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় যাওয়ার পর থেকেই ভাঙ্গার গুরুত্ব বাড়তে থাকে।

ভাঙ্গা মাওয়া মহাসড়কের বাস চালক উজ্জল মাতুব্বর বলেন, ‘প্রথম প্রথম আমিই গাড়ি চালাতে গিয়ে খেই হারিয়ে ফেলতাম। অনেক পরিবহনের চালকদের দেখেছি উল্টা দিকে চলে গিয়েছে।’

ভাঙ্গা রাস্তার মোড় নিয়ে কথা তুলতেই ভাঙ্গা মহিলা কলেজের অধ্যক্ষ এ এইচ এম রেজাউল করিম বলেন, ‘ভাঙ্গা বিশ্বরোড মোড় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার উন্নয়নের এক মহাযজ্ঞ। তিনি প্রধানমন্ত্রী বলেই এরকম উন্নয়ন সম্ভব।’

ভাঙ্গা উপজেলা সদরে এসে কুমার নদ দুটি শাখায় ভাগ হয়েছে। একটি শাখা চলে গিয়েছে দক্ষিণে গোপালগঞ্জের দিকে, আর একটি পূর্ব দিকে মাদারীপুরের দিকে। ভাগ হয়ে যাওয়া কুমার নদের তিন পাড়ে গড়ে ওঠা ভাঙ্গা উপজেলা শহর দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের একুশ জেলার প্রবেশদ্বার। এই প্রবেশদ্বার দিয়ে পশ্চিমে যাওয়া যাবে গোপালগঞ্জ হয়ে খুলনা, বাগেরহাট, সাতক্ষীরা, নড়াইল ও যশোরের বেনাপোল স্থলবন্দর পর্যন্ত । দক্ষিণে মাদারীপুর, বরিশাল, পটুয়াখালী, বরগুনা, পিরোজপুর, ভোলা, ঝালকাঠি পর্যন্ত । উত্তরে ৩০ কিলোমিটার পার হলেই ফরিদপুর শহর। পূর্বে মাদারীপুরের শিবচর হয়ে পদ্মা সেতু পার হলেই আধা ঘন্টারও কম সময়ে ঢাকা। ঢাকার জুরাইন থেকে ফরিদপুরের ভাঙ্গা পর্যন্ত ৫৫ কিলোমিটার। এটি এশিয়ান হাইওয়ের করিডর-১ এর অংশ।

২০১৬ সালে ভাঙ্গায় এই উন্নয়ন কর্মযজ্ঞের শুরু হয়। প্রকল্পটির কাজের অর্থ জোগান দিচ্ছে বাংলাদেশ সড়ক বিভাগ। নির্মাণ কাজের তদারকি করছে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর ২৪ কনস্ট্রাকশন ব্রিগেড। ঢাকা-ভাঙ্গা এক্সপ্রেসওয়ের সঙ্গে ভাঙ্গার মোড়টিও যান চলাচলের জন্য খুলে দেয়া হয় ২০২০ সালের ৮ এপ্রিল। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা গণভবন থেকে যান চলাচলের উদ্বোধন করেন।

উত্তর-দক্ষিণ ও পূর্ব-পশ্চিম যেদিকেই যাওয়া যাক না কেন, ভাঙ্গা যানজটে পড়তে হবে না। প্রয়োজন হবে না গাড়ির ব্রেক চাপার। ভাঙ্গার চার রাস্তার মোড়ে নির্মাণ করা হয়েছে চারটি আন্ডারপাস, একটি ফ্লাইওভার ও চারটি লেন। গাড়ি চলছে প্রতিটি লেন ধরেই। ঢাকার জুরাইন থেকে পদ্মা সেতুর উত্তর প্রান্ত পর্যন্ত ৩৫ কিলোমিটার। পদ্মা সেতুর দক্ষিণ প্রান্ত থেকে ভাঙ্গা পর্যন্ত ২০ কিলোমিটার। পদ্মা সেতু চালু হলে ভাঙ্গা পর্যন্ত যেতে সময় লাগবে ৪২ মিনিট।

ভাঙ্গার প্রবীণ মুক্তিযোদ্ধা, আলগী ইউনিয়ন পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান, কৃষক লীগ কেন্দ্রীয় কমিটির সহ-সভাপতি মিয়ান আব্দুল ওয়াদুদ বলেন, ‘শেখ হাসিনার হাতের ছোয়ায় বদলে যাচ্ছে আমাদের জীবন, যোগাযোগসহ সবকিছু । ভাঙ্গা গোলচত্বর দেখতে বিভিন্ন জেলা থেকে মানুষ আসে। আবার পদ্মা সেতু চালু হলে ভাঙ্গায় রেলওয়ের জংশন হবে। শেখ হাসিনার হাতে যেন উন্নয়নের যাদু।’

ভাঙ্গা উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান এস এম হাবিবুর রহমান বলেন, ‘ভাঙ্গাবাসীর পক্ষ থেকে মাননীয় প্রধানমন্ত্রীকে কৃতজ্ঞতা জানাই। তিনি পদ্মা সেতুর পাশাপাশি ভাঙ্গায় ফ্লাইওভার ও আন্ডারপাসসহ দৃষ্টিনন্দন গোলচত্বর আমাদের উপহার দিয়েছেন।’

মাহবুব হোসেন পিয়াল/চারিদিক/আকাশ