নীরা আপার প্রতি শ্রদ্ধা

ফিচার যশোর জেলার খবর

মৃত্যু অমোঘ। কথায় আছে, ‘জন্মিলে মরিতে হয়।’ কিন্তু কিছু কিছু মৃত্যু সহজে মেনে নেওয়া যায় না। সব মানুষের সাথেতো আর রক্তের বন্ধন থাকে না। তারপরও কিছু কিছু মানুষ এমন আপন হয়ে ওঠেন, রক্তের সম্পর্ক থেকেও বেশি কিছু হয়ে যান এবং এ রকম মানুষের মৃত্যুতে মন প্রবোধ মানে না। নুরজাহান ইসলাম নীরা এমনই একজন মানুষ।

বৃহস্পতিবার (৩ জুন) বেলা বারটার কিছু পরে নীলুদার (নীলু মজুমদার) ফেসবুক পোস্ট থেকে প্রথম নীরা আপার মৃত্যুর খবরটা জানতে পারলাম। তারপর মন এতটাই ভারাক্রান্ত হয়ে ছিল যে দিনের কাজকর্ম স্বাভাবিকভাবে করতে পারিনি। ঘুরে ফিরে নীরা আপার মুখখানা মানসপটে ভেসে উঠছে। মৃত্যুর পূর্ব মুহূর্তে তিনি ছিলেন যশোর সদর উপজেলার নির্বাচিত চেয়ারম্যান। ছিলেন যশোর জেলা মহিলা আওয়ামী লীগের সভাপতি, তারও আগে সাধারণ সম্পাদক। তিনি ছিলেন যশোর পৌরসভার তিন নম্বর ওয়ার্ডের নির্বাচিত কাউন্সিলর। কিন্তু একদিনে হঠাৎ করে অর্থ-প্রতিপত্তির বলে তিনি এখানে আসেননি।

নুরজাহান ইসলাম নীরা ছাত্রজীবনে ছাত্রলীগের রাজনীতির মধ্য দিয়ে একেবারে তৃণমূল পর্যায় থেকে রাজনীতি করতে করতে, রাজপথে মিছিল করতে করতে এই পর্যায়ে পৌঁছেছিলেন। তাইতো অতি সাধারণ কর্মীর সাথেও তার ছিল আত্মার সম্পর্ক। সেজন্য রক্তের বন্ধন না থাকলেও আমার মত নগন্য মানুষের সাথেও তার ছিল আত্মীয়ের বন্ধন। আপন ছোট ভাই’র মত নাম ধরে তুই তোকারি করে সম্বোধন করতেন। এ যে কত আন্তরিকতা তা ভাষা দিয়ে বোঝানো যাবে না। ১৪ বছর এক সাথে রাজপথে চলার স্মৃতি তার সাথে। চাকরি সূত্রে যশোরের বাইরে চলে আসার পরও সে সম্পর্ক মলিন হয়নি। যখনই যশোর গিয়েছি, দেখা হয়েছে, সেই আগের মতই সম্বোধন। তার মৃত্যুতে বড় বোন হারানোর বেদনা যেন বুকে বাজে।

১৯৮৬ থেকে ২০০০ সাল, দীর্ঘ ১৪ বছর ছাত্রলীগ ও যুবলীগের কর্মী হিসেবে যশোরের রাজনীতিতে সক্রিয় ছিলাম। এই চৌদ্দ বছরের প্রথম পাঁচ বছর (১৯৮৬-১৯৯০) প্রচন্ড স্বৈরাচার এরশাদ বিরোধী আন্দোলন এবং পরবর্তী পাঁচ বছর (১৯৯১-১৯৯৬) খালেদা জিয়ার অগণতান্ত্রিক অপশাসন বিরোধী আন্দোলনে যখন যশোরের রাজপথ প্রকম্পিত হত, তখন নীরা আপাকে দেখেছি অকুতভয়ে মিছিলের সামনের কাতারে। আমরা তার পিছনে। এভাবেই সম্পর্ক গড়ে উঠেছিল। ভাই-বোনের সে সম্পর্ক আমৃত্য বজায় ছিল। একটু লেখালেখির সাথে সম্পৃক্ত থাকার জন্য হয়ত আমাকে আরো একটু বেশি স্নেহ করতেন। সেই স্নেহের প্রতিদান দেওয়ার সাধ্য আমার নেই।

দূর থেকে শুধু এই ক্ষুদ্র লেখার মাধ্যমে শ্রদ্ধা নিবেদনের চেষ্টা মাত্র। নীরা আপার চলে যাওয়ার সময় এটা ছিল না। মাত্র ৫৫ বছর বয়স। বেঁচে থাকলে যশোরের আপামোর জনসাধারণকে তিনি আরো অনেক সেবা দিতে পারতেন। তার মত নিরাহঙ্কার, অমায়িক, সদালাপী রাজনীতিক বর্তমান সমাজে বিরল। তাই তার মৃতুতে যশোরের রাজনীতিতে একটা শুণ্যতা সৃষ্টি হল। কিন্তু যা সত্য তাকে মানতে হবে। তিনি পরোপারে শান্তিতে থাকুন, এই প্রার্থনাই করি।

লেখক : প্রভাষক সন্তোষ দাস
সরকারি ফজিলাতুন্নেছা মুজিব মহিলা কলেজ
ফকিরহাট, বাগেরহাট
ই-মেইল : santoshlipi71@gmail.com