রাস্তা তুমি কার, বোয়ালমারী না সালথার?

দেশের খবর ফিচার

বোয়ালমারী-আলফাডাঙ্গা (ফরিদপুর) প্রতিনিধি : ফরিদপুরের বোয়ালমারী উপজেলার দাদপুর ও সালথা উপজেলার বাহিরদিয়া সীমান্তবর্তী দুটি গ্রাম। এ দুই গ্রামের মাঝে রয়েছে দুই উপজেলাকে পৃথককারী বিরাট একটি ফসলি মাঠ। মাঠের মাঝ দিয়ে বয়ে গেছে দাদপুর থেকে বাহিরদিয়ার দিকে চলাফেরার একটি কাঁচা রাস্তা। এ রাস্তা দিয়ে উভয় গ্রামের মানুষের চলাফেরা ও যোগাযোগের একমাত্র মাধ্যম। আশপাশের আরো কয়েকটি গ্রামের বাসিন্দারাও পরস্পর চলাফেরা এ রাস্তা দিয়ে। রাস্তাটির আয়তন প্রায় তিন কিলোমিটার।

সরেজমিন ঘুরে জানা গেছে, এলাকার সত্তর্ধ্ব মুরব্বিদের কথায়, তাঁদের শৈশবে রাস্তাটি নির্মিত হয়েছে। অর্থাৎ রাস্তার বয়স কমপক্ষে ৪০ বছর। স্বাধীনতার পরবর্তী দশকে নির্মিত এই বৃদ্ধ রাস্তাটি স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তীতেও জন্মাবস্থার মত সেই কাঁচাই রয়ে গেছে। বয়সের ভারে তার অবস্থা এখন অনেকটাই জীর্ণশীর্ণ। রাস্তার দুই পাশের বৃহদাকার মাঠের প্রধান দুই ফসল পাট, পিঁয়াজ ও ধান। দূরের গৃহস্থরা এক সময় গরুর গাড়ি এবং বর্তমানে ব্যাটারিচালিত ভ্যান ও নছিমন যানে ফসলাদি বাড়িতে নেন। ক্ষেত থেকে পিঁয়াজ উত্তোলনের সময় বৃষ্টি-বাদল কম থাকায় রাস্তা কাঁচা হলেও কোন মতে মৌসুম অতিবাহিত করে হাফ ছেড়ে বাঁচেন কৃষকরা। কিন্তু ভয়ঙ্কর পরিস্থিতি আসে পাট কাটার সময়; বর্ষা আর বৃষ্টিতে অধিক মানুষের চলাচলের এ রাস্তা দিয়ে আর হাঁটা-চলার উপযোগী থাকে না। এটেল মাটির রাস্তার কাঁদার সঙ্গে পানি মিশে যেন ইটভার কাঁদামাটিতে রূপান্তরিত হয়।

বোয়ালমারী উপজেলার দাদপুর গ্রামের দিকটায় চিতার বাজার নামে বড় একটি ব্যবসায়িক বাজার রয়েছে। সপ্তাহে দুইদিন শনিবার ও মঙ্গলবার এখানে সাপ্তাহিক হাট বসে। সালথা ও বোয়ালমারী মিলিয়ে দুই উপজেলার পিঁয়াজ, পাট ও ধান কেনা-বেচার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বাজার এটি। অন্যান্য পণ্য সামগ্রীও এখানে বিকিকিনি হয়। তাছাড়া হাটের দিন বাদেও চিতার বাজার সব সময় নানা জিনিসপত্রের ক্রেতা-বিক্রেতায় জমজমাট থাকে। বাজারের অনেক ব্যবসায়ী ও ক্রেতা-বিক্রেতা সালথা উপজেলার বাহিরদিয়া গ্রামের মানুষ। গ্রামটির শেষ প্রান্ত থেকে চিতারবাজারের দূরত্ব প্রায় পাঁচ-ছয় কিলোমিটারের দীর্ঘপথ। চিতার বাজার আসতে তাদের যে কি পরিমাণ কষ্ট হয়, তা শুধু ভূক্তভোগীরাই বলতে পারেন।

বর্ষা শুরু হলে চিতার বাজারে আসা-যাওয়ায় বাহিরদিয়াবাসীর যে দূরঅবস্থা পাশের এলাকার মানুষের তা দেখতে হয়। দাদপুরবাসীরও যে রাস্তাটি প্রয়োজন পড়ে না, তা কিন্তু নয়; বরং তারাও ফসল ঘরে তুলতে এ রাস্তাটির সর্বোচ্চ ব্যবহার করে থাকেন। একইসঙ্গে এলাকার প্রাইমারী, হাইস্কুল ও কলেজের শিক্ষার্থীরাও রয়েছে চরম দূর্ভোগে। তাছাড়া বাহিরদিয়া গ্রামে অবস্থিত ফরিদপুরের ঐতিহ্যবাহী সু-প্রাচীন ইসলামী শিক্ষা প্রতিষ্ঠান জামিয়া ইসলামিয়া আজিজিয়াতেও (বাহিরদিয়া মাদরাসা) বোয়ালমারী উপজেলার অনেক ছোট-বড় শিক্ষার্থীরা পড়াশোনা করে। অনাবাসিক শিক্ষার্থীদের প্রতিদিন মাদরাসায় যাওয়া-আসায়ও যথেষ্ঠ কষ্ট স্বীকার করতে হয়। বিশেষ করে দুই গ্রামের মাঝে সংযোগ স্থাপনকারী এ রাস্তাটি সবার জন্য অত্যন্ত জনগুরুত্বপূর্ণ।

এ রাস্তাটির বেহাল অবস্থা শুনে এবং কল্পনার চিত্র দেখে পাঠকদের এ কথা ভাববার কোনই সুযোগ নেই যে, এ অঞ্চলের সব রাস্তা-ঘাটের অবস্থাই এরকম করুণ; বরং দেশের অনেক মফস্বল এলাকার চেয়েও দাদপুর-বাহিরদিয়া সামগ্রিক বিবেচনায় বেশ উন্নত। দুই গ্রামেরই প্রতিটি বাড়িতে বর্তমান আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে বিদ্যুতের আলোয় আলোকিত হয়ে গেছে। ছোট ছোট রাস্তাগুলোও এখন পাকা-পিচঢালা।

কিন্তু এ রাস্তাটি এখনো উন্নয়নের ছোঁয়া লাগেনি। এর কারণ মাত্র একটি তা হলো, রাস্তাটি মূলত কোন উপজেলার; বোয়ালমারীর নাকি সালথার?

সুশিল সমাজ ও এলাকার গন্যমান্যদের থেকে জানা গেছে, ভৌগলিকভাবে রাস্তাটি দুই উপজেলার যৌথভাবে দুটি গ্রামেই অবস্থিত। কিন্তু দুই উপজেলার সীমান্তে পড়ায় এ রাস্তার প্রতি স্থানীয় প্রশাসন ও কর্তাব্যক্তিদের নজর কম। এজন্য স্বাধীনতার ৫০ বছর পরেও ৪০ বছর বয়সী এ রাস্তাটি আজও এক টুকরো ইট-পাথরের ছোঁয়া পায়নি, অথচ দুই গ্রামের সব শ্রেণিপেশা মানুষের প্রয়োজনে রাস্তাটি পাকা-পিচঢালা হওয়া সময়ের গুরুত্বপূর্ণ দাবি।

এলাকাবাসী স্থানীয় প্রশাসন ও কর্তাব্যক্তিদের দৃষ্টি আকর্ষণ করে জানিয়েছেন, এই রাস্তাটি এভাবে আর কতদিন পড়ে থাকবে। বঙ্গবন্ধুর স্বপ্নের সোনার বাংলা গড়ার ‘স্বপ্ন’র মধ্যে কিন্তু এ রাস্তার উন্নতির ব্যাপারটিও আছে। তাই যত দ্রুত সম্ভব রাস্তাটির উন্নয়নে পদক্ষেপ নিতে দুই উপজেলার দুই গ্রামবাসী মানুষের জোর দাবি জানিয়েছেন।

নুর ইসলাম/চারিদিক/সাকিব