বিশ্বজুড়ে বাঙালি সংস্কৃতি বিস্তারে ‘বিশ্বভরা প্রাণ’

ফিচার

‘বিশ্বজুড়ে বাঙালি সংস্কৃতি’ মধুর ও তাৎপর্যপূর্ণ এই শ্লোগানটি বুকে ধারণ করে দেশ বিদেশের প্রায় অর্ধকোটি বাঙালি এই মুহূর্তে ‘বিশ্বভরা প্রাণ’ নামক বিশ্বের সর্ববৃহৎ সাংস্কৃতিক সংগঠনটির পতাকাতলে সমবেত। সংগঠনটি আজ বিশ্বব্যাপী বাংলাভাষা ও সংস্কৃতির দ্যুতি ছড়িয়ে চলেছে। এটি আজ বিশ্বব্যাপী ছড়িয়ে থাকা বাঙালিদের প্রাণের সংগঠনে পরিণত হয়েছে। বিশ্বের তাবৎ বাংলা ভাষা-ভাষী মানুষের প্রাণে প্রাণে মিলন ঘটিয়েছে বিশ্বভরা প্রাণ। হাজার মাইল দূরের কোন সুদূর প্রান্তরের নিভৃতচারী আত্মভোলা বাংলাভাষী সংস্কৃতিসেবীর সাথে বিশ্ববাসীর পরিচয় ঘটিয়েছে ‘বিশ্বভরা প্রাণ’।

২০১৭ সালের ২০ নভেম্বর বাংলা ভাষায় সুস্থ ধারার সংস্কৃতি চর্চার অঙ্গীকার নিয়ে সংগঠনটির আত্মপ্রকাশ ঘটে। সৃষ্টিশীল মানুষেরা সর্বদা নব নব সৃষ্টির উন্মাদনায় নিজেদেরকে ব্যস্ত রাখেন। তেমনি একজন সৃষ্টিশীল মানুষ, একজন স্বপ্নদ্রষ্টা জাহান বশীর, যার মস্তিষ্কের উর্বর উদ্যানে এক নব সৃষ্টির বীজ রোপিত হয়েছিল । আর কোন এক শুভক্ষণে বীজটি অঙ্কুরিতও হয় । সদ্যজাত শিশু চারাগাছটি অতি অল্পদিনে তার শাখা প্রশাখা প্রসারিত করে ফুলে পল্লবে শোভিত আজ এক মহীরুহ। সৃষ্টির শুরু থেকেই বিশ্বভরা প্রাণ বাংলা সাহিত্য ও সংস্কৃতির বিকাশে নিরলস কাজ করে চলেছে। বিশ্বভরা প্রাণ তার শৈশব পেরুতে না পেরুতেই বিশ্বজয়ের গৌরব তিলক ললাটে অংকন করে দৃপ্ত পায়ে এগিয়ে চলেছে। এ চলা প্রগতির পথে চলা, এ চলা অপসংস্কৃতি, কুসংস্কার, ধর্মান্ধতা ও কূপমণ্ডুকতার বিরুদ্ধে শুধুই সামনে চলা।

সাহিত্য ও সংস্কৃতি কোন নির্দিষ্ট ভৌগলিক সীমানায় সীমাবদ্ধ থাকে না। সাহিত্য ও সংস্কৃতির হৃদয়স্পর্শি আবেদন দেশকালের সীমানা পেরিয়ে পৃথিবীর প্রান্তরে প্রান্তরে ছড়িয়ে পড়ে। এ প্রসঙ্গে একটি গল্প মনে পড়ে গেল।

১৯৮০ সালের ঘটনা। কোলকাতার এক জনপ্রিয় সাহিত্যিক গেছেন আমেরিকা বেড়াতে। উদ্দেশ্য দুটো-প্রবাসী বন্ধুদের সাথে দেখা সাক্ষাৎ এবং আমেরিকা ভ্রমণ নিয়ে কিছু লেখালেখি করা। তো, এক সন্ধ্যায় তিনি এক বন্ধুর সাথে নিউইয়র্কের নির্জন রাস্তায় হাঁটছিলেন। এমন সময় জনপ্রিয় একটি বাংলা গানের সুর ভেসে এলো তাদের কানে। অবাক হলেন, এই সূদুর বিদেশ বিভুঁইয়ে বাংলা গান কোথায় বাজে (?) কৌতুহলী হয়ে এগিয়ে গিয়ে দেখলেন একটি প্রাইভেট কারের মিউজিক সিস্টেম থেকে গানটি ভেসে আসছে। আর কারে বসে থাকা এক আমেরিকান সাহেব মাথা দুলিয়ে দুলিয়ে গানটি শুনছেন।

গানটি ছিল ভুপেন হাজারিকার বিখ্যাত একটি গান-‘আজ জীবন খুঁজে পাবি ছুটে ছুটে আয়—।’

গান শেষ হলে সাহিত্যিক সাহেবকে জিজ্ঞাসা করলেন,
– আপনি বাঙালি?
-না।
-তাহলে বাংলা গান শুনছেন?
সাহেব তখন উত্তর দিলেন,
-আমি বাংলা বুঝি না। কিন্তু গানটির সুর আমার খুব ভাল লাগে। তাই অনেক খুঁজে এক বাঙালিকে দিয়ে গানটি ট্রানস্লেট করিয়ে নিয়েছি। আর যখন ডিপ্রেশনে ভুগি তখনই গানটি শুনি। সাহেবের কথা শুনে সাহিত্যিক ও তার বন্ধু তাজ্জব (তথ্য সূত্র : সারেগামাপা রেকর্ড কোম্পানি)।

এই ঘটনা থেকে এটাই প্রমাণিত হয়, গানের সুর, নৃত্যের ছন্দ, তুলির আঁচড় প্রভৃতি শিল্পকর্ম যদি হয় আবেদনময়ী তাহলে তা ভাষা ও দেশের ভৌগলিক সীমারেখা মানে না। আর বর্তমানের বিশ্বায়নের যুগে তথ্য প্রযুক্তির চরম উৎকর্ষের দিনে কোন সংস্কৃতি আর কারো একক অধিকারে নেই, এটা এখন সর্বজনীন। যার আবেদন যত হৃদয়স্পর্শি হবে তার বিস্তার তত দ্রুত ঘটবে। প্রযুক্তির এই সুযোগকে কাজে লাগিয়ে বিশ্বভরা প্রাণও বাংলা সংস্কৃতির দীপ্তি ছড়াচ্ছে দিকে দিকে। বাংলাভাষার অফুরন্ত শব্দ ভান্ডার থেকে ‘বিশ্বভরা প্রাণ’ শব্দ গুচ্ছটি যিনি বেছে নিয়েছিলেন তিনি সত্যিই দূরদর্শী এবং বুঝতে অসুবিধা হয় না এই দূরদর্শী স্বপ্নদ্রষ্টা আর কেউ নন-সংগঠনটির প্রাণ পুরুষ জাহান বশীর। অতি অল্পদিনেই নামকরণের সার্থকতা প্রমাণিত।

করোনার মহাদুর্যোগকালে সংক্রমণ এড়াতে মানুষ একটা দীর্ঘ সময় ঘরে থাকতে বাধ্য হয়েছে এবং এখনো পর্যন্ত প্রাথমিক থেকে শুরু করে বিশ্ববিদ্যালয় পর্যন্ত সকল পর্যায়ের ছাত্র-শিক্ষক ঘরে থেকে হাঁপিয়ে উঠেছে। প্রচলিত বিনোদনের মাধ্যমগুলো যখন তাদের কাছে একঘেয়ে হয়ে যাচ্ছিল, সঙ্গীত শিল্পী, বাচিক শিল্পী, নৃত্য শিল্পীরা যখন তাদের অর্জিত বিদ্যা চর্চার উপযুক্ত ক্ষেত্র পাচ্ছিলেন না, ঠিক তখনই বিশ্বভরা প্রাণের নতুন সংযোজন ‘বিপিপি টিভি’ আসে নতুন স্বপ্ন নিয়ে। বিশ্বভরা প্রাণ’র প্রবাদ পুরুষ, স্বপ্নদ্রষ্টা ও প্রধান চালিকা শক্তি, বিশ্বভরা প্রাণের আন্তর্জাতিক কমিটির সভাপতি শ্রদ্ধেয় জাহান বশীরের নবতর উদ্ভাবন এই ‘বিপিপি টিভি’। তাঁর অনবদ্য সঞ্চালনায় প্রায় প্রতিদিনই মনোমুগ্ধকর অনুষ্ঠান প্রচারিত হচ্ছে। সমকালিন বিষয়ভিত্তিক আলোচনা, সঙ্গীত, নৃত্য, আবৃত্তি ইত্যাদি সাহিত্য ও সংস্কৃতির সকল শাখার শিল্পীবৃন্দ সরাসরি সম্প্রচারিত ‘বিপিপি টিভি’র অনুষ্ঠানে অংশ নিয়ে গৃহবন্দী কোটি মানুষের বিনোদনের খোরাক যোগাচ্ছে।

বাংলাদেশ ও ভারতের পশ্চিম বাংলার বৃহৎ বাঙালি জনগোষ্ঠী ছাড়াও বিশ্বের বিভিন্ন দেশে বসবাসরত বাঙালিরা ‘বিপিপি টিভি’র সাথে যুক্ত হচ্ছেন তাদের নিজ নিজ অবস্থানে থেকে। শিশু থেকে শুরু করে নবীন প্রবীণ সব বয়সী শিল্পীদের মহামিলনকেন্দ্র যেন ‘বিপিপি টিভি’র মঞ্চ। ‘বিপিপি টিভি’ আমাদের সন্তানদের সুপ্ত প্রতিভা বিকাশে অনন্য অবদান রেখে চলেছে। বিশ্বভরা প্রাণ’র গৌরব মুকুটে ইতোমধ্যে যুক্ত হয়েছে আরো কিছু সাফল্যের পালক, তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য- ‘বিশ্বভরা প্রাণ’র সৃজনশীল উদ্যোগ ‘বিবিপি প্রকাশন’ থেকে স্বাধীনতার সুবর্নজয়ন্তী ২০২১ উপলক্ষ্যে প্রকাশ হয়েছে ‘বিশ্বভরা প্রাণ’ এর নির্বাচিত ৫০ জন সনিষ্ঠ কবির প্রায় তিন শতাধিক কবিতা সম্বলিত ‘আবৃত্তির সমকালিন কবিতা’ শীর্ষক একটি সমন্বিত কাব্যগ্রন্থ।

এর পূর্বে ২০২০ সালের জাতীয় গ্রন্থমেলায় ‘বিবিপি প্রকাশন’ থেকে প্রকাশিত হয়েছিলো ১২টি গ্রন্থ। এছাড়াও বিশ্বভরা প্রাণ এর সৃজনশীর উদ্যোগ হিসেবে রয়েছে ‘বিশ্বভরা প্রাণ’ নামক অনলাইন পত্রিকা এবং দ্বিমাসিক সাময়িকী। সৃজনশীল উদ্যোগের মধ্যে রয়েছে ‘বিবিপি ক্র্যাফট’। যেখানে যুক্ত রয়েছেন ‘বিশ্বভরা প্রাণ’ এর অন্তর্ভূক্ত সুবিধাবঞ্চিত বা কর্মহীন অথচ হস্তশিল্পে কর্মদক্ষ নারী শিল্পীগণ। এ উদ্যোগের মাধ্যমে আগামি কয়েক বছরের মধ্যেই অনেক নারীশিল্পী আত্মনির্ভরতার দিকে এগিয়ে যাবেন।

সম্প্রতি শিশু-কিশোরসহ প্রাপ্তবয়স্ক সকল সংস্কৃতিপ্রাণ মানুষের মেধা যাচাই এবং তাদের সুপ্ত প্রতিভা বিকাশের লক্ষ্যে ‘আন্তর্জাতিক পর্যায়ে’ প্রতি বছর সাংস্কৃতিক প্রতিযোগিতাভিত্তিক এ্যাওয়ার্ড প্রবর্তন করা হয়েছে ‘বিশ্বভরা প্রাণ’র শিল্পীদের জন্য। এ এ্যাওয়ার্ডে থাকছে প্রায় ১১টি ক্যাটাগরি। প্রতি ক্যাটাগরিতে ৫টি পুরস্কারসহ প্রতিবছর মোট ৫৫টি পুরস্কার প্রদান করা হবে।

বিশ্বভরা প্রাণ শুধু শিল্প-সাহিত্য-সংস্কৃতি চর্চার মধ্যেই নিজেদের সীমাবদ্ধ রাখেনি। সমাজে যে কোন অন্যায়-অসঙ্গতির বিরুদ্ধে সংগঠনটি সোচ্চার। প্রয়োজনে লেখক তার কলম রেখে, শিল্পী তার বাদ্যযন্ত্র রেখে রাস্তায় দাঁড়িয়েছে ব্যানার হাতে। মানববন্ধনে যোগ দিয়ে অন্যায়ের প্রতিবাদে কন্ঠ মিলিয়েছে। বিশ্ব মহামারি করোনার ভয়াবহ দুর্যোগকালে আর্তমানবতার সেবায় সংগঠনের সদস্যরা মানবিক সহায়তার হাত বাড়িয়ে দিয়েছে।

মাত্র তিন বছর আগে রোপিত ‘বিশ্বভরা প্রাণ’ নামক ছোট চারাগাছটি এখন মহীরুহ। এটা এখন শুধু কোন একটি দেশের জাতীয় সংগঠনই নয়, এটি এখন আন্তর্জাতিক সংগঠন। বর্তমানে বাংলাদেশ, ভারত, যুক্তরাষ্ট্র, অস্ট্রেলিয়া, কানাডা, ইউরোপের ইংল্যা-, জার্মানি, নরওয়ে, সুইডেনসহ মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে বিশ্বভরা প্রাণের শতাধিক শাখা রয়েছে। এ সকল দেশে জাতীয় শাখা ছাড়াও রয়েছে একাধিক জেলা ও আঞ্চলিক শাখা। আশার কথা এই যে, প্রতিনিয়তই বিভিন্ন দেশে বেড়ে চলেছে নতুন নতুন শাখা। এই শাখাগুলির সাথে জড়িয়ে আছেন হাজার হাজার সদস্য, যাঁরা প্রত্যেকেই স্ব স্ব ক্ষেত্রে সুপ্রতিষ্ঠিত।

তাঁরা কেউ সঙ্গীতশিল্পী, কেউ নৃত্যশিল্পী, কেউ আবৃত্তিশিল্পী, কেউ কবি ও কথাশিল্পী, কেউবা সংগঠন গড়ার কারিগর। বিশ্বভরা প্রাণ’র খোলা আকাশে এমন সৃষ্টিশীল নান্দনিক শিল্প চর্চার সাথে জড়িত লক্ষ তারকার ভীড়।

বিশ্বভরা প্রাণ’র স্থপতি জাহান বশীর

এতসব মহাযজ্ঞের নেপথ্যের স্থপতি হলেন বিশিষ্ট কবি, গীতিকার, আবৃত্তিশিল্পী, প্রামাণ্যচিত্র নির্মাতা, সংগঠক, উপস্থাপক ইত্যাদি বহু বিশেষণে বিশেষিত শ্রদ্ধেয় জাহান বশীর। আর তাঁকে যোগ্য সঙ্গ দিয়ে চলেছেন আন্তর্জাতিক কমিটির সাধারণ সম্পাদক চিত্রশিল্পী, আবৃত্তিশিল্পী ও দক্ষ সংগঠক নীপা মোনালিসা, বাংলাদেশ কেন্দ্রিয় কমিটির সভাপতি, কবি ও শিশু সাহিত্যিক শাহানারা ঝরনাসহ জাতীয় ও জেলা পর্যায়ের স্ব স্ব ক্ষেত্রে আলোকিত ও গুণী ব্যক্তিবর্গ।

জয়তু বিশ্বভরা প্রাণ। জয় হোক বিশ্বজুড়ে বাঙালি সংস্কৃতির।

লেখক : প্রভাষক সন্তোষ দাস
সরকারি ফজিলাতুন্নেছা মুজিব মহিলা কলেজ
ফকিরহাট, বাগেরহাট
সহ-সভাপতি : বিশ্বভরা প্রাণ, খুলনা মহানগর শাখা।
ই-মেইল : santoshlipi71@gmail.com