সিডর বিধ্বস্ত শরণখোলায় ১৩ বছরেও হয়নি সুপেয় পানির ব্যবস্থা

দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চল দেশের খবর ফিচার
সংকট নিরসনে মেগা প্রকল্প গ্রহণের দাবি সচেতন নাগরিকদের

মহিদুল ইসলাম, শরণখোলা (বাগেরহাট) : ২০০৭ সালের ১৫ নভেম্বরের প্রলয়ঙ্করী ঘূর্ণিঝড় সিডরের পর থেকে বাগেরহাটের শরণখোলায় সুপেয় পানি সংকট মোকাবেলায় কাজ করেছে অসংখ্য এনজিও। দেশি-বিদেশি দাতা সংস্থা থেকে অগণিত টাকা আনা হয়েছে বিধ্বস্ত এই জনপদকে দেখিয়ে। কিন্তু সিডরের ১৩ বছরেও উপকূলীয় এই উপজেলাটির দেড় লাখ মানুষের পানির দুর্ভোগ কাটেনি। সিডর পরবর্তী সময়ে সুপেয় পানি সংকট নিরসনে এনজিওর মাধ্যমে কি পরিমাণ অর্থ বরাদ্দ ও ব্যয় হয়েছে তার সঠিক হিসাব জানা নেই কারোরই। তাছাড়া, পানি সংকট নিরসনে জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তর থেকে যেসমস্ত প্রকল্প গ্রহণ করা হয়েছে তাও এই ব্যাপক জনগোষ্ঠীর চাহিদার পূরণে যথেষ্ট না। পানি সমস্যার স্থায়ী সমাধানে সরকারি উদ্যোগে মেগা প্রকল্প গ্রহণ করার দাবি জানিয়েছেন সচেতন নাগরিক সমাজ।

বিভিন্ন সূত্র মতে, সিডরের পর একটানা ৬-৭ বছর ধরে পানি ব্যবস্থাপনা নিয়ে যে পরিমাণ অর্থ ব্যয় হয়েছে তা হাজার কোটি টাকারও বেশি হবে। মূলত, তৎকালীন প্রশাসন ও এনজিওদের মধ্যে সমন্বয়হীনতা, অপরিকল্পিতভাবে কাজ করা, তদারকির অভাব, স্বচ্ছতা এবং জবাবদিহিতা না থকায় এই কাড়ি কাড়ি টাকা কোথায় কিভাবে ব্যয় হয়েছে তার সঠিক তথ্য-প্রমাণ নেই কোথাও। উপজেলা প্রশাসনের কাছেও নেই এতো অর্থ ব্যয়ের কোনো হিসাব। বর্তমানে উপজেলাব্যাপী খাবার পানির তীব্র সংকট দেখা দেওয়ায় ওই সমস্ত অর্থের বিষয় নিয়ে প্রশ্ন তুলছেন ভুক্তভোগী ও সচেতন মানুষ।

এদিকে, এনজিওর মাধ্যমে কথিত সেই হাজার কোটি টাকা ব্যয়ের পরও এখনো পানির জন্য ঘরে ঘরে চলছে হাহাকার। খাবার পানি দূরের কথা, গোসল এমন কি পায়খানায় ব্যবহারের পানিও নেই কারো বাড়ি-ঘরে। জলবায়ু পরিবর্তনজনিত কারণে একে তো বৃষ্টিপাত নেই। তাছাড়া ভূ-গর্ভস্থ পানির স্তরও নেমে গেছে। পুকুর, জলাশায় সব শুকিয়ে গেছে। ফলে, দূষিত পানি খেয়ে অসুস্থ হচ্ছে মানুষ। ইতিমধ্যে ডায়রিয়াসহ নানাবিধ পানিবাহিত রোগ চড়িয়ে পড়েছে এলাকায়। হাসপাতালে ডায়রিয়া, আমাশয় রোগীর চাপ বাড়ছে দিন দিন। সুন্দরবনের জেলে ও মৌয়ালদের মধ্যেও ছড়িয়ে পড়েছে ডায়রিয়ার প্রকোপ। পানির কারণেই ছড়াচ্ছে এসব রোগব্যাধী।

এমন সংকটময় মুহূর্তে কোথাও পানির সন্ধ্যান পেলেই সেখানে হুমড়ি খেয়ে পড়ছে মানুষ। বর্তমানে জনস্বাস্থ্য অধিদপ্তর থেকে পাওয়া দুটি মোবাইল ট্রিটমেন্ট প্লান্টের মাধ্যমে সাময়িকভাবে খাবার পানি সরবরাহ করা হলেও উপজেলার মানুষের চাহিদার তুলনায় তা খুবই সামান্য। এসব প্লান্টে শত শত মানুষকে ঘণ্টার পর ঘণ্টা দীর্ঘ লাইনে দাঁড়িয়ে অপেক্ষা করতে দেখা গেছে একটু পানির আশায়।

উপজেলার খুড়িয়াখালী গ্রামের বাসিন্দা মো. রাসেল আহমেদ জানান, ‘তাদের গ্রামে খাওয়ার উপযোগী কোনো পানি নেই। সমস্ত পুকুর শুকিয়ে গেছে। তার উদ্যোগে প্রায় এক কিলোমিটার দূরের একটি পুকুর থেকে ইলেকট্রিক মোটরের সাহায্যে পাইপ লাইনের মাধ্যমে গ্রামের মানুষের জন্য পানির ব্যবস্থা করা হচ্ছে। তার অভিযোগ, সিডরের পরে এনজিওগুলোর অর্থ পরিকল্পিতভাবে ব্যবহার হলে এখন পানি নিয়ে এতো দুর্ভোগে পড়তে হতো না।’

সুন্দরবনের মৌয়াল মো. ছগির হাওলাদার জানান, অন্যান্য বছর তারা পিএসএফ থেকে পানি নিয়ে যেতেন বনে। কিন্তু এবার কোথাও পানি না থাকায় পুকুরের পানি নিয়ে যেতে হয়েছে। দূষিত পানি খেয়ে তাদের নৌকার ৭ জন ডায়রিয়ায় আক্রান্ত হয়েছেন। বনের আরো অনেক মৌয়াল ও জেলে আক্রান্তের খবর জানিয়েছেন তিনি।

সচেতন নাগরিকদের মতামত জানতে চাইলে শরণখোলা প্রেস ক্লাবের সভাপতি ইসমাইল হোসেন লিটন, ‘উপজেলা এনজিও ফোরামের সভাপতি মীর সরোয়ার হোসেন, সমাজসেবক এম ওয়াদুদ আকন বলেন, সিডরের পর ৩০ থেকে ৩৫টি এনজিও দেশি-বিদেশি দাতা সংস্থার কাছ থেকে পানি বিশুদ্ধকরণ, পিএসএফ নির্মাণ, নলকুপ স্থাপন, আরসিসি রেইন ওয়াটার হার্ভেস্টিং নির্মাণ, পুকুর খনন ও সংস্কারের নামে হাজার হাজার কোটি টাকা এনেছে। যা দিয়ে গোটা উপজেলার পানি সমস্যার দীর্ঘস্থায়ী সমাধান করা সম্ভব ছিল। কিন্তু পানি ব্যবস্থাপনায় প্রশাসন ও এনজিওগুলোর মধ্যে সমন্বয় ও তদারকি না থাকায় ইমারজেন্সি কিছু কাজ করে সিংহভাগ অর্থ নয়ছয় করা হয়েছে। ওই সময় ছোট ছোট পুকুর-ডোবায়ও নিম্নমানের পিএসএফ নির্মাণ করা হয়েছে যার কোনো অস্তিত্ব নেই। এমনকি সেসব পুকুরও অস্তিত্বহীন এখন।’

তারা বলেন, এর মধ্যে জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তর এবং ব্র্যাক, গণস্বাস্থ্য কেন্দ্র, প্রদীপনসহ হাতেগোনা কয়েকটি এনজিওর পরিকল্পিতভাবে করা কিছু পিএসএফ ও ওয়াটার ট্রিটমেন্ট প্লান্ট এখনো সচল রয়েছে। এ থেকে যে পরিমান সুপেয় পানি সরবরাহ হচ্ছে তা চাহিদার তুলনায় একভাগও না। তাদের মতে, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে ধীরে ধীরে বৃষ্টিপাত কমে আসছে। এমন পরিস্থিতিতে মেগা প্রকল্প গ্রহণ ছাড়া পানি সমস্যার স্থায়ী সমাধান কোনোভাবেই সম্ভব নয়। উপজেলাটির দুই দিকে দুটি বড় নদী ভোলা ও বলেশ্বর। এই নদীর পানি ব্যবহার করেই এর সমাধান খুঁজতে হবে। উপজেলার জনসংখ্যার অনুপাত হিসাবে পানির প্লান্ট স্থাপন করতে হবে। একইভাবে বড় বড় পুকুর খনন করতে হবে। যাতে শুষ্ক মৌসুমে ওই পুকুরগুলোতে বৃষ্টির পানি সংরক্ষিত থাকে। এ ছাড়া কৃষি সেচের জন্য উপজেলার ভরাট হওয়া পরিত্যক্ত খালগুলো খনন করে মূল নদীর সঙ্গে সংযোগ স্থাপন করে পানিপ্রবাহ সচল রাখতে হবে। তবেই দীর্ঘদিনের পানির সমস্যার সমাধান করা সম্ভব বলে তারা মনে করেন।

শরণখোলা জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তর সূত্রে জানা গেছে, উপজেলায় এ পর্যন্ত ১ হাজার ৪৫৭টি নলকুপ স্থাপন করা হয়েছে। এর মধ্যে সচল আছে ৫৬৬টি। লবণাক্ততায় এর পানি অনেকটা ব্যবহার অনুপযোগী। রেইন ওয়াটার হার্ভেটিংয়ের জন্য তিন হাজার লিটার ধারণ ক্ষমতাসম্পন্ন ১ হাজার ১৩৩টি প্লাস্টিকের ট্যাংক দেওয়া হয়েছে। কিন্তু বৃষ্টি না হওয়ায় বর্তমানে তা কোনো কাজে আসছে না। এ ছাড়া ১হাজার ১০০টি পিএসএফের মধ্যে বর্তমানে দুই শ’র মতো চালু থাকলেও পুকুরে পানি না থাকায় তার অধিকাংশ বন্ধ। ১০টি সোলার পিএসএফ এবং ১৮টি ন্যানো ফিল্টার চালু হয়েছে। এ ছাড়া ২১টি বড় পুকুর খনন করা হয়েছে। তার মধ্যে ১৩টির পানি ব্যবহার করছে মানুষ।

উপজেলা জস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরের উপসহকারী প্রকৌশলী এস এম মেহেদী হাসান জানান, ২০০৭ সালের পর থেকে এ পর্যন্ত বিভিন্ন সংস্থার মাধ্যমে পানি ব্যবস্থাপনা নিয়ে কি পরিমাণ কাজ বা অর্থ ব্যয় হয়েছে এর কোনো তালিকা তাদের কাছে নেই। তৎকালীন এনজিওগুলো তাদের সঙ্গে কোনোপ্রকার সমন্বয় করেনি।

শরণখোলা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) সরদার মোস্তফা শাহিন বলেন, ‘সিডর পরবর্তী সময়ে সুপেয় পানি সংক্রান্ত যে কাজগুলো হয়েছে তার কোনো তথ্য আমাদের কাছে নেই। কারণ তখন ইমারজেন্সি প্রকল্পের মাধ্যমে এনজিওগুলো কাজ করায় কোনো সমন্বয় হয়নি।’

এ ব্যাপারে জানতে চাইলে জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তর খুলনা সার্কেলের তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী মো. জামানুর রহমান বলেন, সুপেয় পানি সংকট নিরসনে রেইন ওয়াটার হার্ভেষ্টিংয়ের মাধ্যমে ‘উপকূলীয় অঞ্চলে নিরাপদ খাবার পানি সরবরাহ প্রকল্প’ নামে সাড়ে ৫০০ কোটি টাকার একটি প্রজেক্ট অনুমোদনের অপেক্ষায় রয়েছে। তাছাড়া, প্রধানমন্ত্রীর ঘোষণা অনুযায়ী ভূ-গর্ভস্থ পানিরব্যবহার কমিয়ে ভূ-উপরিস্থ পানির সংরক্ষণ ও ব্যবহারের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। সেই আলোকে রেইন ওয়াটার হার্ভেষ্ট করার জন্য পানির আধার তৈরিতে কমিউনিটিভিত্তিক বড় পুকুর খননের পরিকল্পনা রয়েছে। পাশাপাশি ভোলা ও বলেশ্বর নদের লবণ পানি শোধন করে সুপেয় পানি সরবরাহের জন্য বড় ধরণের কোনো প্রকল্প গ্রহণ করা যায় কিনা সে ব্যাপারেও বিবেচনা করা হবে।

মহিদুল ইসলাম/চারিদিক/সাকিব