ঐতিহাসিক নাটোর রাজবাড়ি

ফিচার

‘আমি ক্লান্ত প্রাণ এক, চারিদিকে জীবনের সমুদ্র সফেন, আমারে দুদন্ড শান্তি দিয়েছিল নাটোরের বনলতা সেন।’

নাটোর রাজবাড়ি দেখে ফিরতি পথে প্রধান ফটকের উপরে (ফটকের উল্টো দিকে, ঢোকার সময় নয়, বেরোনর সময় চোখে পড়ে) রূপসী বাংলার কবি রোমান্টিক কবি জীবনানন্দ দাশের বিখ্যাত ‘বনলতা সেন’ কবিতার লাইন দুটি চোখে পড়ল। জীবনানন্দ দাশের কবিতা, নাকি নাটোরের রাজবাড়ি অথবা নাটোরের কাঁচাগোল্লা, কোনটি নাটোরকে বিখ্যাত করেছে এ নিয়ে হয়ত তার্কিকরা বিতর্ক করতে পারেন। কিন্তু ভ্রমণ পিপাসুরা ছোট্ট শহর নাটোর এবং এর আশপাশে বেশ কিছু দর্শনীয় পুরাকীর্তি দেখে মুগ্ধ হতে পারেন।

এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য-নাটোর রাজবাড়ি (রাণী ভবানীর বাড়ি নামেও পরিচিত), নাটোর কালিবাড়ি, উত্তরা গণভবন ইত্যাদি।

এসব দেখে ক্লান্ত হয়ে নাটোরের কাঁচাগোল্লা (সন্দেশ) খেয়ে ক্লান্তি দূর করতে পারেন। যদিও আমাদের যশোর-খুলনা অঞ্চলের কাঁচাগোল্লার সাথে স্বাদের কোন পার্থক্য আমি বুঝিনি, দামের পার্থক্য ছাড়া। আমাদের এদিকে কাঁচাগোল্লার কেজি তিন বা সাড়ে তিনশ টাকা হলেও নাটোরে কিন্তু পাঁচশ টাকা কেজি। জানিনা হয়ত নামের জন্যই দাম বেশি।

যাহোক ধান ভানতে শিবের গীত আর নয়। আমাদের উত্তর বঙ্গ ভ্রমণের অষ্টম বা শেষ দিনে আমরা নাটোর শহর ও এর আশপাশের দর্শনীয় স্থানগুলি ঘুরলাম। নাটোর জেলার প্রত্নতাত্বিক নির্দশন গুলির মধ্যে সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য রানী ভবানীর স্মৃতি বিজোড়িত নাটোর রাজবাড়ি।

রাজবংশের ইতিহাস :
ঐতিহাসিকদের মতে অষ্টাদশ শতকের শুরুতে নাটোর রাজবংশের উৎপতি হয়। সমগ্র উত্তর বঙ্গের জমিদার বর্গের মধ্যে নাটোর রাজবংশের মান-মর্যাদা, ঐতিয্য, বিষয়-সম্পত্তি, জনহিতকর কাজ ইত্যাদি সবকিছুতে ছিল অগ্রগণ্য। ১৭০৬ খ্রিস্টাব্দে পরগণা বানগাছির বিখ্যাত জমিদার গণেশরাম রায় ও ভবানী চরণ চৌধুরী রাজস্ব প্রদানে ব্যর্থ হওয়ায় জমিদারচ্যুত হন। দেওয়ান রঘুনন্দন উক্ত পরগণা নিজ ভ্রাতা রাম জীবনের নামে বন্দোবস্ত নেন। এভাবেই নাটোর রাজবংশের গোড়া পত্তন হয়। রাজা রাম জীবন ১৭০৬ মতান্তরে ১৭১০ খ্রিস্টাব্দে নাটোরের রাজা হিসেবে প্রতিষ্ঠা লাভ করেন।

১৭৩৪ খ্রিস্টাব্দে রাজা রামজীবনের মৃত্যু হলে তাঁর দত্তক পুত্র রামকান্ত রাজা হন। রাজা রামকান্ত রাজা হওয়ার চার বছর আগে ১৭৩০ খ্রিস্টাব্দে ভবানী রাণীকে বিয়ে করেন। ভবানী ছিলেন বগুড়া জেলার আদম দিঘীর ছাতিনা গ্রামের আত্তরাম চৌধুরী ও জয়দূর্গার কন্যা। তাঁর জন্ম বাংলা ১১২২ (ইংরেজি ১৭১৬) সালে। ১৭৪৮ খ্রিস্টাব্দে রাজা রামকান্তের মৃত্যু হলে নবাব আলীবর্দী খাঁ রাণী ভবানীর উপর জমিদারীর ভার অর্পণ করেন।

রাণী ভবনী ছিলেন বিচক্ষণ ও বুদ্ধিমতি মহিলা। তিনি প্রজ্ঞা দ্বারা প্রজাদের মন জয় করেন এবং তাঁর জমিদারীর সীমা বহুদূর পর্যন্ত বাড়াতে সক্ষম হন। রাণী ভবানীর রাজত্বকালে তাঁর জমিদারী রাজশাহী, পাবনা, বগুড়া, কুষ্টিয়া, যশোর, রংপুর, ভারতের পশ্চিম বঙ্গের মুর্শিদাবাদ, বীরভূম, মালদাহ ইত্যাদি জেলাব্যাপী বিস্তৃতি লাভ করে। বলা চলে তিনি অর্ধেক বাংলার রাজত্ব করতেন। এজন্য তাঁকে ‘অর্ধেবঙ্গেশ্বরী’ বলা হত। ১৮০২ সালে রাণী ভবানীর মৃত্যুর পর তাঁর দত্তক পুত্র রামকৃষ্ণ জমিদারীর দায়িত্বভার গ্রহণ করেন। বাংলা ১২০৩ সালে তাঁর মৃত্যুর পর রাজা বিশ্বনাথ এবং রাজা শিবনাথ এই দুই ভাইয়ের মধ্যে জমিদারী বন্টন হয়। রাজা বিশ্বনাথ বড় তরফ এবং রাজা শিবনাথ ছোট তরফ হিসেবে পরিচিত ছিলেন। রাজা বিশ্বনাথের বংশধররা হলেন যথাক্রমে রাজা গোবিন্দ চন্দ্র (দত্তক), মহারাজা জগদীন্দ্রনাথ ও কুমার যোগিন্দ্রনাথ। এঁরা পর্যাক্রমে বড় তরফের অংশের জমিদারী দেখাশোনা করতেন।

অন্যদিকে, রাজা শিবনাথের বংশধররা হলেন যথক্রমে রাজা আনন্দনাথ, যোগেন্দ্রনাথ, জিতেন্দ্রনাথ ও কুমার বীরেন্দ্রনাথ। তাঁরা ছোট তরফের জমিদারী দেখাশোনা করতেন। রাণী ভবানীর বংশধরদের মধ্যে মহারাজা জগদীন্দ্রনাথ সর্বাপেক্ষা সমাজসেবী ও প্রজাপালক জমিদার ছিলেন।

রাজবাড়ি প্রতিষ্ঠা :
১২০ একর জমির উপর নাটোর রাজবাড়িটি দাঁড়িয়ে আছে। এটি এখন নাটোর শহরের কেন্দ্রে অবস্থিত হলেও আজ থেকে ৩১০ বছর আগে ওখানে কোন শহরই ছিল না। ওটা ছিল একটি বিল যার নাম ছিল ‘ভাতঝাড়ার বিল।’

বিশাল জমিদারীর রাজধানী নিজ জন্মভূমিতে স্থাপনের উদ্দেশ্যে বড় ভাই দেওয়ান রঘুনন্দন ও ছোট ভাই রাজা রামজীবন তৎকালীন ভাতঝাড়ার বিলকে নির্বাচন করেন। তখন এই বিল ছিল পুঠিয়া রাজা দর্পনারায়ণের সম্পত্তি। এজন্য রঘুনাথ ও রামজীবন রাজা দর্পনারায়ণের নিকট বিলটি রায়তী স্বত্বে পত্তনীর জন্য আবেদন করেন। রাজা দর্পনারায়ণ বিলটি ব্রক্ষ্মোত্তর সম্পত্তি হিসেবে নতুন রাজা রামজীবনকে দান করেন। রাজা রামজীবন ঐ বিলে দীঘি, পুকুর, চৌকি খনন করে বিলটিকে সমতল করেন এবং ১৭০৬-১৭১০ খ্রিস্টাব্দের মধ্যে বাড়িটি নির্মাণ করেন।

এর আগে তারা থাকতেন ভারতের মুর্শিদাবাদের বড়নগরে। রাজা রামজীবন ‘নাট্যপুর’ নামে ওই এলাকার নতুন নাম করণ করেন। সেই নাট্যপুর থেকে আজকের নাটোর। নিরাপত্তার জন্য তৎকালে বাড়ির চারপাশে চৌকি (লেক) খনন করা হয়েছিল যা বর্তমানেও বিদ্যমান। এছাড়া রাজবাড়ির আঙ্গিনায় ৫টি বড় আকারের পুকুর রয়েছে। রাজবাড়ির পুরো এলাকা দুটি অংশে বিভক্ত-বড় তরফ ও ছোট তরফ। ছোট বড় ৮ টি ভবন এখনো বিদ্যমান। বৃহৎ কয়েকটি ভবন সম্প্রতি সংস্কার করা হয়েছে। এখনো অনেকগুলি ভবন সংস্কারহীন জরাজীর্ণ অবস্থায় কালের স্বাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়ে আছে।

রাজবাড়ির অভ্যান্তরে তিনটি মন্দির আছে, যথা-আনন্দময়ী কালি মন্দির, তারকেশ্বর শিব মন্দির ও শ্যাম সুন্দর মন্দির। লেক বেষ্টিত বিশাল রাজবাড়ি, পুকুর, নানা প্রকার গাছপালা, নির্জন পরিবেশ এবং এর সাথে ইতিহাসের ছোঁয়া সব মিলিয়ে ভ্রমণ পিপাসুদের জন্য নাটোর রাজবাড়ি আকর্ষণীয়। বাড়িটি বাংলাদেশ প্রত্তত্ব অধিদপ্তরের অধীনে। এছাড়াও নাটোর জেলা প্রশাসন ১৯৮৬ সাল থেকে বাড়িটি রাণী ভবানী কেন্দ্রীয় উদ্যান (যুব পার্ক) হিসেবে পরিচালনা করে আসছে (তথ্য সূত্র : বাংলাদেশ প্রত্নতাত্বিক অধিদপ্তর ও উইকিপিডিয়া)।

রাজবাড়ি ছাড়াও ৩০০ বছরের পুরোন নাটোর কালিবাড়ি বেশ নাম করা। অষ্টাদশ শতকে দিঘাপতিয়া রাজপরিবারের দেওয়ান শ্রী দয়ারাম রায় কালি মন্দিরটি প্রতিষ্ঠা করেন। এর পুরো নাম শ্রী শ্রী জয় কালি মাতার মন্দির। সম্প্রতি (জুলাই ২০২০) বাংলাদেশ ও ভারত সরকারের যৌথ অর্থায়নে মন্দিরটি সংস্কার করে নয়নাভিরাম করা হয়েছে। সংস্কারে মোট ব্যয় হয় ১.৩৩ কোটি বাংলাদেশী টাকা । এর মধ্যে ভারত সরকার দেয় ৯৭ কোটি টাকা এবং বাকি টাকা দেয় বাংলাদেশ সরকার (তথ্য সূত্র : দি ওয়াল, ২৭ জুলাই ২০২০)। এছাড়া শহর থেকে ৩ কিমি উত্তরে আর এক ঐতিহাসিক স্থাপনা ‘উত্তরা গণভবন’ ভ্রমণ পিপাসুদের কাছে আকর্ষণীয় দ্রষ্টব্য। সে গল্প আর এক দিন।

লেখক : প্রভাষক সন্তোষ দাস
সরকারি ফজিলাতুন্নেছা মুজিব মহিলা কলেজ
ফকিরহাট, বাগেরহাট
ই-মেইল : santoshlipi71@gmail.com