মৃত্যুও যেন গা সহা হয়ে গেছে

ফিচার

গত বছর (২০২০) করোনাভাইরাস যখন চীনে তান্ডব চালিয়ে সেখান থেকে ইউরোপ-আমেরিকা মাহাদেশে পাড়ি জমাল তখনও আমরা কিছুটা রিলাক্স মুডে ছিলাম। ভেবেছিলাম এটা মনে হয় শীত প্রধাণ দেশের ভাইরাস অথবা এটা ধনী দেশের আদরের জামাই, আমাদের এদিকে আসবে না। ভাববার যথেষ্ট কারণও ছিল।

২০১৯ সালের শেষ থেকে ২০২০ সালের প্রথম দিক পর্যন্ত যে কয়মাস শীতের প্রকোপ বেশি ছিল সেই কয়মাস চীনে ভাইরাসটি ব্যাপক ধ্বংসযজ্ঞ চালিয়ে গরমের শুরুতে কিছুটা রণে ভঙ্গ দিয়ে পশ্চিমা শীত প্রধাণ দেশ সমূহের দিকে ধাবিত হয়েছিল। কিন্ত আমাদের ধারণা বেশি দিন স্থায়ী হয়নি, যখন দেখা গেল নিরক্ষীয় অঞ্চলের গরমের দেশ ব্রাজিলসহ মধ্যপ্রাচ্যের মরুর দেশ সমূহে করোনা বীর বীক্রমে পৌঁছে গেল। করোনার উৎপত্তি যেখানেই হোক তার মিশন ছিল বিশ্বভ্রমণ। তাই সব জল্পনা কল্পনার অবসান ঘটিয়ে মার্চের (২০২০) ৮ তারিখে আমাদের দেশে প্রথম করোনা রোগী শনাক্ত হলো। আমরা এবার একটু নড়ে চড়ে বসলাম। আমাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্মের নিরাপত্তার কথা বিবেচনা করে ১৭ মার্চ (২০২০) থেকে দেশে সব ধরণের শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বন্ধ ঘোষণা করা হলো। প্রথম রোগী শনাক্ত হওয়ার দশ দিন পর ১৮ মার্চ (২০২০) যখন প্রথম করোনা আক্রান্ত রোগী মারা গেল তখন আমরা ভীষণ আতঙ্কগ্রস্ত হয়ে পড়লাম।

মুজিববর্ষ এবং স্বাধীনতা দিবসের মত আমাদের জাতীয় জীবনে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দুটি দিবসকে কেন্দ্র করে গৃহীত সকল কর্মসূচী স্থগীত করা হলো। আক্রান্তের সংখ্যা এবং মৃত্যুর সংখ্যা দিন দিন একটু একটু করে বাড়তে থাকল। কিন্তু ২৫ মার্চ (২০২০) পর্যন্ত আক্রান্তের সংখ্যা ৪২ এবং মৃত্যুর সংখ্যা ৫ এর উপরে ওঠেনি। তারপরও সংক্রমণের বিস্তার রোধে এবং সারাদেশের মানুষের নিরাপত্তা বিবেচনা করে ২৬ মার্চ (২০২০) থেকে দেশব্যাপী লকডাউন ঘোষণা করা হলো। হাতে গোনা কিছু চরম অসচেতন মানুষ ছাড়া পুরো দেশবাসী স্বতঃস্ফূর্তভাবে সেই লকডাউন পালন করেছে। সরকারের বিভিন্ন সংস্থা, ইলেকট্রনিক ও প্রিন্ট মিডিয়ার ব্যাপক জনসচেতনতা মূলক প্রচার মানুষ গুরুত্ব সহকারে গ্রহণ করল। কষ্ট হলেও তারা ঘরে থেকেছে। সবচেয়ে বড় বিষয় মানুষের মধ্যে করোনা নিয়ে একটা আতঙ্ক কাজ করেছে। ফলে ধীরে ধীরে প্রকোপ কমে এসেছিল। সবকিছু স্বাভাবিক হয়ে আসছিল। স্কুল-কলেজ খোলার ঘোষণা হয়ে গেল। এর মধ্যে টিকা এসে আমাদের মনোবল বাড়িয়ে দিল।

কিন্তু মাননীয় প্রধানমন্ত্রিসহ বিশেষজ্ঞরা সাবধান বাণী উচ্চারণ করেছিলেন।

তারা বলেছিলেন, ‘টিকা নিলেও আমাদের স্বাস্থ্যবিধি মানতে হবে, আমাদের মাস্ক পরতে হবে। দ্বিতীয় ঢেউ এর আশঙ্কা আছে।’

কিন্তু আমরা তা মানলাম না। তাই করোনা তার ভয়ঙ্কর রূপ নিয়ে ঘুরে দাঁড়িয়েছে। এক বছর পর করোনার আচরণ এবং মানুষের আচরণ উভয় ক্ষেত্রেই বিপরীত একটা চিত্র দেখা যাচ্ছে। গত বছর মাত্র একজন মারা গেলে আমরা যে পরিমাণ ভয় পেয়েছিলাম এবং সাবধান হয়েছিলাম, এবার ১০০ জন মারা যাওয়াতেও আমরা ভয় পাচ্ছি না। অন্ততঃ আমাদের আচরণে সেরকম কোন লক্ষণ নেই। মৃত্যুও আমাদের গা সহা হয়ে গিয়েছে। গত চার দিন (১৬ এপ্রিল-১৯ এপ্রিল) ধরে মৃত্যুর সংখ্যা ১০০ এর উপরে। এত মৃত্যুও যদি আমাদের সচেতন না করে, তবে কিসে আমরা সচেতন হবো? এত মৃত্যু, এত প্রচার, এত সাবধান বাণী, লক ডাউন, কিছুই আমাদের ঘরে আটকে রাখতে পারছে না। তাহলে আর কি হলে আমরা ঘরে থাকব? বুঝলাম নিম্ন আয়ের মানুষ পেটের দায়ে বেরুতে বাধ্য হচ্ছে। কিন্তু প্রতিদিন রাস্তায় আমরা যাদের দেখি, খবরের কাগজে যাদের ছবি ছাপা হয়, টিভির পর্দায় যাদের রাস্তায় ঘুরতে দেখা যায় তারা সবাই কি নিম্ন আয়ের মানুষ?

গত বছর লকডাউন চলাকালে সরকারি ও বেসরকারি পর্যায় থেকে নিম্ন আয়ের মানুষদের ব্যাপক মানবিক সহায়তা করা হয়েছিল। এবারও সরকার তাদের সাহায্যের প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। আজই (২১ এপ্রিল ২০২১) খবরে দেখলাম প্রধানমন্ত্রী সাড়ে দশ কোটি টাকা বরাদ্দ দিয়েছেন লকডাউনে কর্মহীন অসহায় মানুষের জন্য। হয়ত খুব তাড়াতাড়ি তারা তা পাবেন। কিন্তু এবার বেসরকারি পর্যায়, স্বেচ্চাসেবী সংগঠন সমূহ বা ব্যক্তি পর্যায় থেকে তেমন একটা ত্রাণ তৎপরতা এখনো চোখে পড়ছে না। হতে পারে বছরাধিককাল ধরে করোনার তান্ডবে সব সেক্টরই পর্যুদস্ত। তাই গত বছরের মত এবার মানুষ আর মানুষের পাশে দাঁড়াতে পারছে না। কিন্তু আমাদের দেশে ধনী মানুষের অভাব নেই। সুইজ ব্যাংকে টাকা রাখার লোকেরও অভাব নেই। এরা যদি এই দুঃসময়ে কর্মহীন দরিদ্র মানুষের পাশে দাঁড়াতেন তাহলে হয়ত লকডাউন সফল হত। আর লকডাউন সফল হওয়ার অর্থই হলো করোনার বিস্তার রোধ।

করোনার দ্বিতীয় ঢেউ মোকাবেলায় চলতি মাসের ৫ তারিখ থেকে প্রথম পর্যায়ে এক সপ্তাহের জন্য লকডাউন ঘোষণা করা হয়েছিল। যদিও আমাদের মত সাধারণের কাছে সেটা ছিল লকডাউন, সংবাদপত্রের ভাষায় ঢিলেঢালা লকডাউন আর সরকারি ভাষায় বিধিনিষেধ। কিন্তু সে যাইহোক, মানুষ একেবারে তা মানেনি। দুই একদিনের মধ্যেই সে ব্যবস্থা ভেঙে পড়েছিল। সপ্তাহ না ঘুরতেই সরকার সব কিছু শিথিল করতে এক প্রকার বাধ্যই হয়েছিল। এরই প্রেক্ষিতে ১৪ এপ্রিল থেকে দ্বিতীয় পর্যায়ে আরো এক সপ্তাহের জন্য কঠোর লকডাউন কার্যকর করা হলো এবং সেটা ২২ এপ্রিল থেকে আরো এক সপ্তাহ বৃদ্ধি করার ঘোষণা হয়েছে। কিন্তু কার্যত দেখা যাচ্ছে মানুষের ভিতর লকডাউন ভাঙার যেন একটা প্রতিযোগিতা চলছে। পুলিশের টহল, ম্যাজিস্ট্রেটের জরিমানা, ব্যাপক প্রচার, অগনিত মৃত্যু কোন কিছুই আমাদের আটকাতে পারছে না।

সুতরাং, পরিস্থিতি কোথায় গিয়ে দাঁড়াবে আমরা জানি না। হাজার হাজার সাধারণ মানুষের সাথে ইতোমধ্যে রাজনীতিবিদ্, মিডিয়া ব্যক্তিত্ব, চিত্র জগতের স্টার সহ বেশ কয়েকজন জনপ্রিয় ও নামকরা মানুষকে আমরা হারিয়েছি এই প্রাণঘাতি করোনায়। আরো কয়েকজন জনপ্রিয় ব্যক্তিত্ব জীবন-মৃত্যুর সন্ধিক্ষণে। এসব মৃত্যু আমাদের চোখে আঙ্গুল দিয়ে দেখিয়ে দিচ্ছে করোনা কাউকে খাতির করে না। তারপরও আমরা বুক ফুলিয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছি! আর নয়, আসুন আমরা সতর্ক হই। পাশাপাশি নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিদের কাছে আবেদন, আপনারা নিজ নিজ এলাকার জনগণকে ঘরে রাখতেএবং স্বাস্থ্যবিধি মানতে সক্রিয় ভূমিকা পালন করুন।

লেখক : প্রভাষক সন্তোষ দাস
সরকারি ফজিলাতুন্নেছা মুজিব মহিলা কলেজ
ফকিরহাট, বাগেরহাট
ই-মেইল : santoshlipi71@gmail.com