বাংলা বর্ণমালার শুদ্ধ চর্চা হোক প্রতিদিন

কলাম ফিচার

অনেক আত্মত্যাগের বিনিময়ে বাংলা ভাষা আজ মর্যাদাপূর্ণ আসনে অধিষ্ঠিত। ভাষার জন্য আত্মোৎসর্গের নজির বিশ্বে একমাত্র আমাদেরই রয়েছে। তাইতো দেরীতে হলেও ইউনেস্কো আমাদের আত্মত্যাগের স্বীকৃতিস্বরূপ ২১ ফেব্রুয়ারি দিনটিকে আর্ন্তজাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসেবে ঘোষণা করেছে। এই ঘোষণা বাংলা ভাষার মর্যাদাকে এক অনন্য উচ্চতায় পৌঁছে দিয়েছে। এটা নিঃসন্দেহে আমাদের গর্ব ও অহংকারের দিক। কিন্তু দুঃখের বিষয় আমরাই আবার এই মর্যাদাকে ভুলুন্ঠিত করছি প্রতিনিয়ত।

ভাষা আন্দোলনের পর প্রায় সত্তর বছর পার হয়ে গেলেও সর্বস্তরে বাংলা ভাষার প্রচলন করা সম্ভব হয়নি এবং শুদ্ধ বাংলা চর্চার তাগিদও নেই। এফএম রেডিও, টিভি ও মঞ্চের তরুণ উপস্থাপকরা ইংরেজি বাংলা হিন্দি মিলিয়ে এক অভিনব ভাষায় কথা বলে। মানুষ,বিশেষ করে শিক্ষার্থীরা উপস্থাপকদের কাছ থেকে অনেক কিছু শেখে। তাই তাদের ভাষা মার্জিত হওয়া উচিত। সমাজের প্রতি গণমাধ্যমের দায়বদ্ধতার কথা তাদের ভুলে যাওয়া উচিত নয়।

ইংরেজি ভাষায় অনেক পন্ডিত ব্যক্তি আছেন যাঁরা বাংলায় বক্তব্য দেওয়ার সময় বিশুদ্ধ বাংলা বলেন। আবার ইংরেজিতে বক্তব্য দেওয়ার সময় বিশুদ্ধ ইংরেজি বলেন। তাঁরা কখনোই একটার সাথে আর একটা মিশিয়ে বাংলিশ করেন না। কিন্তু আমার মনে হয়, আজকাল কিছু মানুষ নিজেদেরকে স্মার্ট হিসেবে জাহির করতেই কথা বলার সময় কারণে অকারণে দু’চারটা ইংরেজি বলেন। ‘উই আর লুকিং ফর শত্রুস’ সাবেক স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রি লুৎফুজ্জামান বাবরের এই বিখ্যাত উক্তিটি আমরা ভুলে যাইনি। শুধু যে বাংলার মধ্যে ইংরেজি তাই নয়, বিকৃত উচ্চারণ ও ভুল বানানের ছড়াছড়িও লক্ষণীয়। এর মাধ্যমে একদিকে যেমন আমাদের প্রিয় মাতৃভাষার অমর্যাদা করা হয়, অন্যদিকে ভাষা শহীদদের আত্মদানকেও অসম্মান করা হয়।

আজকাল একুশের চেতনা তরুণদের মধ্যে প্রায় অনুপস্থিত। আমরা যখন স্কুল কলেজের ছাত্র ছিলাম তখন যে উৎসাহ উদ্দিপনায় একুশ পালন করতাম বা যে সংখ্যায় প্রভাত ফেরীতে অংশ নিতাম তা এখন দেখা যায় না। দেশে লোক বাড়লেও একুশের প্রভাত ফেরীতে দিন দিন লোক কমে যাচ্ছে। তরুণরা এখন একুশের সকালটা ঘুমিয়েই কাটায়। তাদের মধ্যে চেতনা জাগ্রত না হওয়ার জন্য হয়ত আমরা বড়রাই দায়ী। শহর কেন্দ্রিক তরুণ-যুব সমাজের মধ্যে সুন্দর এবং শুদ্ধ করে বাংলা বলার ক্ষেত্রেও অনিহা লক্ষণীয়। বাংলা হিন্দি এবং ইংরেজি মিলিয়ে খিচুড়ি করতে ওস্তাদ তারা। কোনটাই ঠিক হয় না।

এক্ষেত্রে রবীন্দ্রনাথের একটা ঘটনা মনে পড়ল। কোথায় যেন পড়েছিলাম। রবী ঠাকুর একবার জাহাজে করে বিদেশ থেকে ফিরছিলেন। একই জাহাজে বিলেত থেকে সদ্য ইঞ্জিনিয়ারিং পাস করা এক বাঙালি যুবকও ছিলেন। যুবক যখন জানলেন জাহাজে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর আছেন তখন তিনি ভাবলেন, যাই কবিগুরুর সাথে একটু গল্প করে আসি। যুবক ইঞ্জিনিয়ার রবীন্দ্রনাথের সাথে ইংরেজিতে কথা বলছিলেন। কথার মাঝে একসময় তিনি কিছুটা কৈফিয়তের সুরে বললেন, ‘দীর্ঘদিন বিদেশে থাকতে থাকতে বাংলা ভুলে গিয়েছি। তাই ইংরেজি বলছি।’

কবি তখন স্মিত হাস্যে বললেন, ‘তাতে দুঃখ ছিল না যদি ইংরেজিটাও শুদ্ধ করে বলতে।’

আমাদের তরুণদের অবস্থা অনেকটা ওই যুবকের মত। এরা ইংরেজি হিন্দি আর বাংলা মিলিয়ে ‘হিংবাংলিশ’ করে ফেলছে। মাতৃভাষার মর্যাদার প্রতি তাদের যেন কোন অঙ্গীকারই নেই। রবীন্দ্রনাথ তাঁর আমার ছেলেবেলা প্রবন্ধে লিখেছেন, ‘সেজদা বলতেন, আগে চাই বাংলা ভাষার গাঁথুনি তারপর ইংরেজি শেখার পত্তন।’ এর অর্থ এই যে, প্রথমে নিজের ভাষার বুনিয়াদ ভাল করে গড়ে তবেই অন্য ভাষা শিখতে হবে। পৃথিবীর উন্নত জাতি তাদের নিজস্ব ভাষা, কৃষ্টি, সংস্কৃতির ব্যাপারে কোন আপোস করে না। কিন্তু আমাদের দেশে রক্তরঞ্জিত বাংলা বর্ণমালার অবমাননা দেখি সর্বত্র।

নিজ মাতৃভাষার প্রতি উদাসীন তাদের উদ্দেশ্যে মধ্যযুগের কবি আবদুল হাকিম একটু কঠিন কথাই বলেছেন। তিনি তাঁর বঙ্গবাণী কবিতায় বলেছেন,

‘‘যে সবে বঙ্গেত জন্মি হিংসে বঙ্গবাণী।
সে সব কাহার জন্ম নির্ণয় ন জানি।।
দেশ ভাষা বিদ্যা যার মনে ন জুয়ায়।
নিজ দেশ তেয়াগী কেন বিদেশ ন যায়।।”

বাংলায় জন্ম গ্রহণ করেছে অথচ বাংলা ভাষার প্রতি যাদের অনুরাগ নেই তাদের জন্ম পরিচয় নিয়ে কবি সন্দেহ প্রকাশ করেছেন। স্বভাষার প্রতি যাদের মমতা নেই কবি তাদের স্বদেশ ত্যাগ করে বিদেশে চলে যেতে বলেছেন। আজ থেকে প্রায় চার’শ বছর আগে মাতৃভাষার প্রতি মানুষের উদাসীনতা দেখে কবি ব্যথিত হয়েছিলেন। আজ এই আধুনিক যুগেও আমরা আমাদের চারপাশে অনুরূপ মানুষ দেখতে পাই।

আমাদের পূর্বসূরীরা তাঁদের জীবন দিয়ে মাতৃভাষার মর্যাদা প্রতিষ্ঠা করে গেছেন। আর আমরা কি পারব না সে মর্যাদা রক্ষা করতে? তাই একুশের দিনে একটাই শপথ হোক, আমরা যেন নিজ ভাষা, সাহিত্য, সংস্কৃতির প্রতি তরুণ প্রজন্মের অনুরাগ সৃষ্টি করতে পারি। আর শুধু একুশের দিনেই নয়, প্রতিদিন প্রতিক্ষণে শুদ্ধ বাংলা চর্চা করি। রক্তরঞ্জিত বাংলা বর্ণমালার মর্যাদা রক্ষার দায়িত্ব আমাদের সকলের।

লেখক : প্রভাষক সন্তোষ দাস
সরকারি ফজিলাতুন্নেছা মুজিব মহিলা কলেজ
ফকিরহাট, বাগেরহাট
ই-মেইল : santoshlipi71@gmail.com