প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের পর যুক্তরাষ্ট্র কি ভেঙে যাবে?

আন্তর্জাতিক কলাম

আবদুল মান্নান।।
যুক্তরাষ্ট্র যে দেশটি কথায় কথায় অন্য দেশকে গণতন্ত্রের তালিম দেয়, স্বচ্ছ নির্বাচন ব্যবস্থা গড়ে তোলার নিয়মিত পরামর্শ দেয়, সেই দেশে আগামী ৩ নভেম্বর প্রেসিডেন্ট নির্বাচন হবে এবং সেই নির্বাচন নিয়ে বিশ্বের অন্যান্য দেশের আগ্রহ থাকলেও খোদ যুক্তরাষ্ট্রে আছে শঙ্কা ও অনেক স্টেটে আতঙ্ক । ধারণা করা হচ্ছে, রিপাবলিকান প্রার্থী ডোনাল্ড ট্রাম্প ও ডেমোক্রেট প্রার্থী জো বাইডেন যিনিই  সেই নির্বাচনে জিতুক, নির্বাচন পরবর্তী সময়ে সেই দেশে লেগে যেতে পারে ভয়াবহ দাঙ্গা আর ঘটতে পারে প্রাণহানি। কোনও কোনও বিশ্লেষকের মতে, দেশটির ইতিহাসে প্রথমবারের মতো জারি হতে পারে সামরিক আইন, ডাকা হতে পারে ন্যাশনাল গার্ড অথবা অন্য কোনও মিলিশিয়া। আবার এক দল আরও একটু এগিয়ে গিয়ে বলেন, এই নির্বাচন ইতি ঘটাতে পারে যুক্তরাষ্ট্রের, যদিও এই মতের সঙ্গে একমত নন বেশিরভাগ  বিশ্লেষক। তবে এটা সত্য, যুক্তরাষ্ট্র ১৮৬০ সালের গৃহযুদ্ধের সময় ভেঙে যাওয়ার দ্বারপ্রান্তে পৌঁছে গিয়েছিল।

বারাক ওবামাকে যুক্তরাষ্ট্রের বর্ণবাদীরা কখনও সহজভাবে তাদের প্রেসিডেন্ট হিসেবে মেনে নেয়নি। একদল বলতো সে মুসলমান, আর অন্য দল মনে করতো যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট একজন কৃষ্ণাঙ্গ  হবে তা অকল্পনীয়। ওবামা দ্বিতীয়বার প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হওয়ার পর যুক্তরাষ্ট্র হতে প্রকাশিত প্রখ্যাত অনলাইন পত্রিকা হাফিংটন পোস্ট এক জরিপ চালিয়ে বলেছিল, ২২ শতাংশ আমেরিকান ও ৪৩ শতাংশ রিপাবলিকান দলের সমর্থকরা মনে করে তাদের স্টেট স্বাধীন হয়ে যাওয়া উচিত। ক্যালিফোর্নিয়া অর্থনৈতিকভাবে যুক্তরাষ্ট্রের সবচেয়ে শক্তিশালী অঙ্গরাজ্য, স্বাধীন রাষ্ট্র হলে এই মুহূর্তে সেটি হতো বিশ্বের পঞ্চম অর্থনৈতিক শক্তি, ব্রিটেন হতেও বড় । এই রাজ্যের মানুষরা যুক্তরাষ্ট্র থেকে পৃথক হয়ে একটি আলাদা রাষ্ট্র গঠন করার প্রত্যাশা পোষণ করেন অনেক দিন ধরে। অনেক বিশ্লেষক বলেন, সোভিয়েত ইউনিয়ন বা যুগোশ্লাভিয়া যদি ভেঙে যেতে পারে তাহলে যুক্তরাষ্ট্রও একসময় ভেঙে যেতে পারে।  তবে এই মুহূর্তে এই সম্ভাবনা কিছুটা কল্পনাপ্রসূত বলে মনে হয়।

ইতোপূর্বে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনকে ঘিরে আর কখনও এমন পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়নি। এর একমাত্র কারণ বর্তমান প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এই নির্বাচনে কোনোভাবেই হারতে চান না। এমন ঘটনা অন্য  অনেক উন্নয়নশীল দেশে, যেমন ২০০৬ সালের বাংলাদেশে,  ঘটলেও যুক্তরাষ্ট্রের মতো একটি উন্নত দেশে কখনও ঘটবে তা কল্পনাতীত ছিল। এর অন্যতম কারণ সেই দেশের জটিল নির্বাচন ব্যবস্থা, যা অনেক মার্কিনিও বুঝতে পারেন না । নির্বাচনে যে প্রার্থী সবচেয়ে বেশি ভোট পান তিনি নাও জিততে পারেন। ২০১৬ সালের নির্বাচনে হিলারি ক্লিন্টন ডোনাল্ড ট্রাম্প  থেকে ত্রিশ লক্ষ ভোট বেশি পেয়েছিলেন, কিন্তু প্রেসিডেন্ট হয়েছিলেন রিপাবলিকান প্রার্থী ডোনাল্ড ট্রাম্প। কারণ, ইলেক্ট্রোরাল কলেজ ভোট বেশি ছিল ট্রাম্পের। এবারের পরিস্থিতিকে আরও জটিল করেছে নির্বাচনে আগাম সূক্ষ্ম কারচুপির সম্ভাবনাকে কেন্দ্র করে। হ্যাঁ, পাঠক ঠিকই শুনেছেন। সূক্ষ্ম কারচুপি। তা হওয়ার সম্ভাবনা দেখা দিয়েছে যুক্তরাষ্ট্রে, বাংলাদেশে নয়। ২০০১ সালে বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা নির্বাচনে হেরে যাওয়ার পর যখন প্রথমবার সেই শব্দ দুটি উচ্চারণ করেন তখন তা নিয়ে বিভিন্ন মহলে সেকি হাসি ঠাট্টা।

যুক্তরাষ্ট্রের নির্বাচন নিয়ে আমি নিয়মিত আমার একাধিক বন্ধুর সঙ্গে যোগাযোগ রাখি, তাদের বিশ্লেষণ শুনি। গত সোমবার আমার এক বন্ধু আগাম পোস্টাল ভোট দেওয়ার কথা ছিল। কিন্তু তাদের এলাকায় পোস্টালের ব্যালটে কারচুপি হতে পেরে জেনে সে ঠিক করেছে নির্বাচনের দিন সশরীরে গিয়ে ভোট দেবে। নির্বাচনের দিন ছাড়াও যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে আগাম ভোট দেওয়া যায় অথবা ডাকের মাধ্যমেও ভোট দেওয়া যায়। এবার আগাম ভোট বা ডাকের মাধ্যমে ভোট দেওয়ার প্রবণতা বেশি লক্ষ করা যাচ্ছে। এর অন্যতম কারণ সাধারণ ভোটাররা মনে করছেন, নির্বাচনের দিন দেশটির অনেক স্থানে ভয়াবহ দাঙ্গা-হাঙ্গামা হতে পারে। করোনার ভয়ও আছে। সাধারণত ডেমোক্র্যাটদের মধ্যে ভোটকেন্দ্রে না যাওয়ার প্রবণতা একটু বেশি। ঐতিহাসিকভাবে কৃষ্ণাঙ্গ, ল্যাটিনো, হিসপানিক, মেক্সিক্যান, এশিয়ানদের মধ্যে ডেমোক্র্যাট সমর্থক বেশি বলে ধারণা করা হয় কিন্তু ভোটের দিন ভোট দিতে না যাওয়ার সংখ্যাটাও তাদের মধ্যে বেশি। তবে এবার এই প্রবণতা কমবে বলে মনে করা হচ্ছে। কারণ, তাদের ধারণা ট্রাম্প এবার জয়ী হলে যুক্তরাষ্ট্র থেকে একটি বিরাট সংখ্যক অভিবাসীদের বের করে দেবে আর অভিবাসন আইনে আসবে অনেক কড়াকড়ি, যদিও ট্রাম্প ও তার স্ত্রী মেলানিয়া দু’জনই অভিবাসী ছিলেন। মেলানিয়া যদিও বহু বছর ধরে যুক্তরাষ্ট্রে বসবাস করছিলেন, তিনি সেই দেশের প্রথম বৈধ ভিসা পান ২০০১ সালে, যা আবার সংরক্ষিত ছিল আইনস্টাইনের মতো মেধাবীদের জন্য। এই ভিসার প্রচলিত নামই হচ্ছে আইনস্টাইন ভিসা। ২০০৬ সালে  নাগরিকত্ব পান মেলানিয়া। ট্রাম্পের ভয় হচ্ছে যত বেশি আগাম ভোট বা পোস্টাল ব্যালট পড়বে তার জন্য লড়াইটা আরও বেশি কঠিন হয়ে পড়বে।

যুক্তরাষ্ট্রের ভোটাররা যদিও সমর্থন বিচারে রিপাবলিকান আর ডেমোক্র্যাট হিসেবে চিহ্নিত হয়ে থাকে, তথাপি সেই দেশের অনেক রাজ্য আছে যাদের ভোটারদের মধ্যে দলগত আনুগত্য তেমন শক্ত হয় না। এই নির্বাচনে ডেমোক্র্যাট তো পরের নির্বাচনে রিপাবলিকান। এদের বলা হয় সুইং বা দোদুল্যমান ভোটার। আর যেসব রাজ্যে এদের আধিক্য বেশি সেগুলোকে বলা হয় ব্যাটল গ্রাউন্ড স্টেট। এসব রাজ্যের ভোটাররা প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। প্রার্থীদের লক্ষ্য থাকে এসব রাজ্যের ভোটারদের তাদের দিকে টানা। বলা হয় এমন রাজ্যের সংখ্যা বারোটি, যার মধ্যে আছে কলোরাডো, ফ্লোরিডা, মিসিগ্যান, ওহায়ও, ভার্জিনিয়া প্রভৃতি। এই বারোটি রাজ্যে জেতার জন্য সব প্রার্থীই মরিয়া হয়ে থাকে। কারণ, এই রাজ্যগুলোতে জিততে পারলে ইলেক্ট্রোরাল কলেজ ভোট তাদের ভাগে পড়বে। সব প্রার্থী সত্য অসত্য কথা ও অঙ্গীকার দিয়ে এই রাজ্যগুলোর ভোট পাওয়াটা নিশ্চিত করতে মরিয়া হয়ে ওঠে। মার্কিনিরা সাধারণত গণমাধ্যমের কথা খুব বিশ্বাস করে। তবে এবারের নির্বাচনে একটি লক্ষণীয় দিক হচ্ছে, যুক্তরাষ্ট্রে মূলধারার গণমাধ্যমের সমর্থন হারিয়েছেন ট্রাম্প।

এবার আসি সূক্ষ্ম কারচুপি প্রসঙ্গে। আমার বন্ধু জানালো শেষ মুহূর্তে সে পোস্টাল ব্যালটে ভোট না দিয়ে সশরীরে গিয়ে নির্বাচনের দিন ভোট দেবে। কারণ হিসেবে সে বলেছে,  তারা যে এলাকার ভোটার সেই এলাকায়  ডেমোক্র্যাটপন্থী ভোটারদের সংখ্যা একটু বেশি। তার ও তার মতো অন্যরা যারা পোস্টাল ব্যালট চেয়েছে তাদের ব্যালটের ঠিকানায় পোস্টাল কোডে সামান্য একটু ইচ্ছাকৃত ভুল করা হয়েছে। ব্যালটে প্রার্থীদের ক্রমিক নম্বরও ওলটপালট করে দেওয়া হয়েছে। ভোট গণনার সময় বলা হতে পারে এই ঠিকানাগুলো ভুল, মেশিনে ব্যালট গণনার সময় তা ভুলভাবে গোনা হবে। টেক্সাসের হ্যারিস কাউন্টিতে আনুমানিক পঁচিশ লক্ষ ভোটার আছে। ধারণা করা হচ্ছে এদের বেশিরভাগ ডেমোক্র্যাট। দ্রুত ভোট দেওয়ার জন্য আনুমানিক দুইশ’ কেন্দ্র প্রয়োজন। প্রশাসন উপরের নির্দেশে ঠিক করলো এবার এই সংখ্যা কমানো হবে। তাতে ভোটাররা ভোটকেন্দ্রে যেতে নিরুৎসাহিত হবে। ভোটকেন্দ্রে যেতে রাস্তাটি সংস্কার প্রয়োজন অনেক দিন ধরে। ঠিক ভোটের কয়েকদিন আগে বেশ বড় একটা বোর্ড লাগিয়ে বলা হলো ‘এই সড়ক মেরামতের জন্য বন্ধ’। কেন্দ্রে যেতে হলে পাঁচ বা দশ মাইল ঘুরে যেতে হবে। এত কষ্ট কে করে! বুশ জুনিয়র আর এলগোরের নির্বাচনের সময় শুরু হয়েছিল ভোট দেওয়ার ও ব্যালট গোনার মেশিনে গণ্ডগোল। ফ্লোরিডাতে এই ঘটনা ঘটে। আদালত বললো ব্যালট হাতে গুনতে হবে। ফলাফল আর আসে না। দিন যায় সপ্তাহ যায়। সারা দুনিয়া অপেক্ষা করছে। ফ্লোরিডা একটি সুইং রাজ্য। এই রাজ্যের ভোটে নির্ধারিত হয়ে যেতে পারে কে হচ্ছেন আগামী দিনের মার্কিন প্রেসিডেন্ট। তিন সপ্তাহ পর উচ্চ আদালত নির্দেশ দিলো আর অপেক্ষা করা যাবে না, গণতন্ত্রের ব্যাপক ক্ষতি হয়ে যেতে পারে। ফ্লোরিডার ভোট গণনা ছাড়া ঘোষণা করা হোক নির্বাচনের ফলাফল। বুশ হলেন আমেরিকার প্রেসিডেন্ট। ফ্লোরিডার ভোট গণনা শেষ হলে দেখা গেল বুশ নন, আসলে প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হয়েছিলেন এলগোর। তখন ফ্লোরিডার গভর্নর ছিলেন বুশের ভাই জেব বুশ। শেষতক পরাজিত বুশকে নির্বাচিত করে যুক্তরাষ্ট্রের গণতন্ত্র রক্ষা হলো। আর বুশ শুরু করলেন মধ্যপ্রাচ্যে গণতন্ত্র রফতানি।

ট্রাম্পের ঘোষিত শত্রু হচ্ছে চীন। বুধবার নিউ ইয়র্ক টাইমস খবর দিচ্ছে, যুক্তরাষ্ট্রের বাইরে ট্রাম্পের তিনটি দেশে ব্যাংক হিসাব আছে- ইংল্যান্ড, আয়ারল্যান্ড আর চীনে। এই তিন হিসাবের মধ্যে সবচেয়ে বেশি নিয়মিত লেনদেন হয় চীনের ব্যাংকে। এই ব্যাংক থেকে  ট্রাম্প চীনে দুই লক্ষ ডলার কর দিয়েছেন। চীনের সঙ্গে ট্রাম্পের ব্যবসায়িক সম্পর্ক অনেক পুরনো। এর আগে খবর প্রকাশিত হয়েছিল প্রেসিডেন্ট থাকাকালীন ট্রাম্প মাত্র সাড়ে সাত শত ডলার আয়কর দিয়েছেন। সমর্থকরা বললো তাতে কী? মাঝখানে খবর রটলো ট্রাম্প করোনায় আক্রান্ত। নিয়ে যাওয়া হলো এক সামরিক হাসপাতালে। তিন দিন পর হাসপাতাল হতে বের হয়ে হোয়াইট হাউজে। জানালেন বিশ্বের সেরা চিকিৎসা পেয়েছেন তিনি। কাশতে কাশতে বললেন মাস্ক পরে কোনও লাভ নেই। তার সমর্থকরা বললেন তথাস্তু। সকলে মাস্ক খুলে দিব্যি পানাহারে লিপ্ত হলেন।

মঙ্গলবার পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্রে দুই লক্ষ ছাব্বিশ হাজার মানুষ করোনায় প্রাণ হারিয়েছেন। তবে এটাও ঠিক ট্রাম্পের আদৌ করোনা হয়েছিল তা অনেকে বিশ্বাস করেন না। অনেকে মনে করেন এটা তার আর একটা স্টান্টবাজি। সেই দেশের মানুষ স্টান্ট খুব পছন্দ করে।
এটি অস্বীকার করার উপায় নেই এবারের যুক্তরাষ্ট্র প্রেসিডেন্ট নির্বাচন একটি জবরদস্ত থ্রিলারের মতো। আগামী ৩ তারিখ নির্বাচনের পর কী হবে তা বলা মুশকিল। তবে ট্রাম্প ইতোমধ্যে ঘোষণা করেছেন, যদি তিনি হেরেও যান তাহলেও তিনি সহজে হোয়াইট হাউজ ছাড়ছেন না। চেষ্টা করবেন যে কোনোভাবে ফলাফল তার দিকে নিয়ে আসতে। তা যদি না হয় তাহলে তিনি দেশ ত্যাগ করতে পারেন। মার্কিন ডলারের ওপর লেখা থাকে  ‘In God We Trust’, ঈশ্বরের ওপর আমাদের বিশ্বাস আছে। গণতন্ত্রের মঙ্গল হোক। তবে এটা ঠিক এই নির্বাচনের ফলাফল বাংলাদেশের জন্য তেমন একটা গুরুত্বপূর্ণ নয়। ট্রাম্প কোম্পানির সঙ্গে বাংলাদেশের ব্যবসা ঠিকই চলবে। বাংলাদেশে প্রস্তুত গার্মেন্টস তার খুব পছন্দ। চিন্তা করছি যুক্তরাষ্ট্রের গণতন্ত্র বাংলাদেশের চেয়ে উন্নত কোনও মাপকাঠিতে ।

লেখক: বিশ্লেষক গবেষক

সূত্র : কালেরকন্ঠ