নাজমার লক্ষী গরু !

চারিদিক স্পেশাল দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চল

মহিদুল ইসলাম, শরণখোলা (বাগেরহাট)।।
‘লক্ষী গরু, একলগে দুই-তিনডা বাচ্চা দেয়। এবার তিনডা বাচ্চা দিছে। গতবারও দুইডা বাচ্চা দিছিলো কিন্তু একটাও বাঁচেনাই। পয়সার অভাবে গরুডারে ডাক্তার দ্যাহাইতে পারিনা। এট্টু খইল-ভুষি কিন্না খাওয়ামু যে- হে কায়দাও নাই। বাচ্চা তিনডায় ঠিকমতো দুধ পায়না। সংসারে অভাব। নিজেগো খাইতে কষ্ট অয়, হেয়ার পরও বেচিনা। কেউ যদি সাহায্য করতো তাইলে গরুগুলানরে বাঁচাইতে পারতাম’!
বলছিলেন বাগেরহাটের শরণখোলা উপজেলা সাউথাখলাী ইউনিয়নের সুন্দরবনের কোলঘেঁষা উত্তর সোনাতলা আশ্রয়ণ প্রকল্পের আদর্শ গ্রামের বাসিন্দা শ্রবন প্রতিবন্ধী নাজমা বেগম। গত বৃহস্পতিবার (২৪সেপ্টম্বর) দুপুরে তার পালিত গাভিটি একসাথে তিনটি বাচ্চা প্রসব করেছে। গাভী এবং বাচ্চা তিনটি কি খাইয়ে বাঁচাবেন এখন সেই চিন্তায় পড়েছেন হতরদ্রি ওই নারী।

শনিবার দুপুরে আশ্রয়ণ প্রকল্পের ওই বাড়িতে গিয়ে দেখা যায়, নিজেদের বসতঘরের বারান্দায় বাচ্চা তিনটি কম্বল পেঁচিয়ে রেখেছেন নাজমা বেগম। কয়দিন ধরে প্রবল বৃষ্টির কারণে বাচ্চাগুলো ঠান্ডায় অনেকটা দুর্বল হয়ে পড়েছে। ঠিকমতো খাবার না পাওয়ায় গাভী ও বাচ্চা তিনটি ভুগছে অপুষ্টিতে। একটি গাভীর একসাথে তিনটি বাচ্চা হয়েছে শুনে এলাকার নারী-পুরুষ বৃষ্টি উপেক্ষা করে দেখার জন্য ছুঁটে আসছে ওই বাড়িতে।
নাজমা বেগম জানান, পাঁচ বছর আগে ব্র্যাক থেকে গাভীটি ত্রাণ হিসেবে পেয়েছিলেন। তিন বছর লালন পালনের পর গতবছর ঘূর্ণিঝড় বুলবুলের রাতে গাভীটিসহ তারা আশ্রয় নেয়স্থানীয় সাইক্লোন শেল্টারে। সেখানেই একসাথে দুটি বাচ্চা প্রসব করে। কিন্তু ঠান্ডা লেগে বাচ্চা দুটি মারা যায়। এবার আবার একসাথে তিনটি বাচ্চা হয়েছে। এর মধ্যে একটি এঁড়ে ও দুটি বকনা বাছুর। একেকবারে দুই-তিনটি বাচ্চা হওয়ায় গাভীটি তার কাছে লক্ষী। একারণে অনেকেই গাভীটি কিনতে চায়। তাই শত কষ্টের মাঝেও সেটি বিক্রি করেননি।

নাজমা বেগম নিজে ঠিকমতো কানে শুনতে পাননা। স্বামী জাফর হাওলাদার কিছুটা শারীরিক ও বুদ্ধি প্রতিবন্ধী। তিনি উপজেলা সদর রায়েন্দা বাজারে থেকে মানুষের বাসাবাড়িতে কাজ করেন। বাড়িতে মাঝেমধ্যে আসেন। দুই ছেলে, দুই মেয়ের মধ্যে এক মেয়ের বিয়ে হয়েছে। পাশেই সুন্দরবন। বড় ছেলে বনে মাছ ধরে যা আয় করে তা দিয়ে কোনোমতে চলে তাদের সংসার। গরুগুলোকে বাঁচানোর জন্য মানুষের সহযোগীতা চেয়েছেন তিনি।
দর্শনার্থী দক্ষিণ রাজাপুর গ্রামের দুলাল চাপরাসি ও সোনাতলা গ্রামের সোহাগ হোসেন ফকির জানান, একটি গাভী একসাথে তিনটি বাচ্চা দিয়েছে এটা তাদের কাছে একটা আশ্চর্যজনক বিষয়। শরণখোলার কোথাও এর আগে এমন ঘটনা ঘটেনি। তাই খবর শুনে তারা দেখতে এসেছেন। বাচ্চা তিনটি বেঁচে থাকলে গরীব পরিবারটি উপকৃত হবে।

শরণখোলা উপজেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা ডা. জিএম আব্দুল কুদ্দুস বলেন, একসঙ্গে তিনটি বাচ্চা প্রসব এটি একটি ব্যতিক্রম ঘটনা। একাধিক শুক্রাণু নিষিক্ত হওয়ার কারণে এমনটি ঘটে। মানুষেরও মাঝেমধ্যে এমন হয়। এতে বাচ্চা অপুষ্ট হয়ে জন্মগ্রহণ করে। বেশিরভাগ ক্ষেত্রে বাচ্চা টেকেনা। দরিদ্র নারীর গাভী ও বাচ্চার চিকিৎসার ব্যাপারে সহযোগিতা করা হবে জানান এই কর্মকর্তা।