দুর্যোগের পর দুর্ভোগে শরণখোলার সহস্রাধিক পরিবার

চারিদিক স্পেশাল দেশের খবর

মহিদুল ইসলাম,শরণখোলা (বাগেরহাট)
দুর্যোগ কেটে গেলেও দুর্ভোগ কমেনি বাগেরহাটের শরণখোলার বেড়িবাঁধের বাইরের ছয় গ্রামের সহ¯্রাধিক পরিবারের।এক সপ্তাহেরও বেশি সময় তারা প্রবল জোয়ারের পানির সঙ্গে যুদ্ধ করেছে। জোয়ার আর বাতাসের তোড়ে তছনছ হয়ে গেছে ঘর। অনেকের ঘরের মেঝের মাটি সরে বসবাসের অনুপযোগী হয়ে পড়েছে। কোথায় থাকবে সেই চিন্তায় পড়েছে কয়েকটি পরিবার। পানির চাপ কমে যাওয়ায় এখন আবার ঘুরে দাঁড়ানোর চেষ্টা করছে পরিবারগুলো।
গত সোমবার উপজেলার সাউথখালী ইউনিয়নের বগী, দক্ষিণ চালিতাবুনিয়া, ত্যাড়বেকা ও খোন্তাকাটা ইউনিয়নের রাজৈর গ্রাম ঘুরে দেখা গেছে বেড়িবাঁধের বাইরে বসবাসকারী মানুষের দুর্ভোগের চিত্র।
ত্যাড়াবেকা গ্রামের গ্রামের দিনমজুর সেলিম শিকদারের বাড়ি গিয়ে দেখা যায়, পানি টেনে যাওয়ার পর তার স্ত্রী তহমিনা বেগম (৪০) ঘরের মালামল গোছাতে ব্যাস্ত। এসময় তিনি বলেন,ঘরের মদ্যেদিয়া জোয়ারের পানির স্রোত বইয়া গ্যাছে। পোলা-মাইয়্যা লইয়া হারা রাইত খাডের উপর বইয়া থাকছি। রাইতে ঘুমাইতে পানি নাই। চাইর দিন কিছুই রানতেও পারি নাই। বিস্কুট, চিড়া খাইয়া রইছি। আইজ কয়ডা রানছি।
তিনি জানান, শনিবার রাতে মুরগির ঘরে জোয়ারের পানি ঢুকে তার চারটি হাঁস, সদ্য ফোটা বাচ্চাসহ ২০টি মুরগি মারা গেছে। ঘরের সমস্ত মালামাল ভিজে তছনছ হয়ে গেছে। ২২বছর ধরে বেড়িবাঁধের বাইরে ত্যাড়াবেকা নদীর পাড়ে সরকারি জমিতে বসবাস করছেন তারা। দুর্যোগ ছাড়াও স্বাভাবিক জোয়ারে তাদের ঘরে পানি উঠে যায়।
দক্ষিণ চালিতাবুনিয়া গ্রামের নদী পারের বাসিন্দা বিধবা শাফিয়া বেগম (৬০) জানান, জোয়ার এলেই দুঃখের আর সীমা থাকেনা। ঘরের মধ্যে পানি উঠে যায়। স্বামী রতন খান সিডরের আগের বছর মারা গেছে। স্বামী কোনো সহাসম্বল রেখে যাননি। অন্য কোথাও যাওয়ারও জায়গা নেই তাদের। তাই বাধ্য হয়ে যুগ যুগ ধরে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে নদী পারে বসবাস করতে হচ্ছে।
ওই গ্রামের কাচামাল ব্যবসায়ী মিরাজ ফরাজী জানান, জোয়ারে পানিতে তার দোকানের দুই ডালা পান, বিভিন্ন তরিতরকারিসহ প্রায় ১৫ হাজার টাকার মালামাল নষ্ট হয়ে গেছে। এখন টাকা অভাবে দোকান চালাতে পারছেন না।
বগী গ্রামের বলেশ্বর নদের মোহনায় বসবাসকারী মুক্তিযোদ্ধা রুস্তম আলী খান (৭০) জানান, তার ঘরের মধ্যে দুই-তিন ফুট পানি উঠেছিলো। এখনও তার ঘরে রান্না করতে পারছেন না। ঘরের মধ্যে ফাঁটল ধরেছে। যে কোনো সময় নদীতে বিলিন হয়ে যাবে তার বসতঘরটি। একই গ্রামের বাদশা পেয়াদা (৬০) জানান, তিন-চার দিন শুধু চিড়া-মুড়ি খেয়ে দিন কেটেছে।
ইব্রাহীম পঞ্চায়েত (৪৫) জানান, তাদের সমস্ত জমিজমা বলেশ্বর গিলে খেয়েছে। এবারে জোয়ারে দুই চালা টিনের ঘরটি তছনছ করে দিয়ে গেছে। পানি অবস্থা খারাপ দেখে বৃদ্ধ মা আলেতন্নেছা (৮০) ও দুই ছেলে-মেয়েকে পার্শ্ববর্তী সাতঘর গ্রামে রেখে এসেছেন। জোয়ারের তোড়ে ঘরের নিচের মাটি সরে গেছে। ঘরের যা অবস্থা তাতে থাকার কোনো উপায় নেই।
খোন্তাকাটা ইউনিয়নের রাজৈর গ্রামের রাহেলা বেগম জানান, পানি উঠে ঘরের এমন অবস্থা হয়েছে তাতে মানুষ বাস করতে পারে না। ঘূর্ণিঝড় আম্ফানে ঘরের ওপর গাছ পড়ে বিধ্বস্ত হয়েছে। সেই ভাঙা ঘরে ছিলেন এতোদিন। কিন্তু জোয়ারের পানির চাপে টিকতে না পেরে অসুস্থ স্বামীকে নিয়ে উঠেছেন তার এক আত্মীয়ের বাড়িরতে। এখনো ঘরে ফিরতে পারেননি। জোয়ার-ভাটার সঙ্গে যুগ যুগ ধরে যুদ্ধ করে এখন ক্লান্ত হয়ে পড়েছেন।
সাউথখালী ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান বীর মুক্তিযোদ্ধা মোজাম্মেল হোসেন জানান, তার ইউনিয়নের বগী, দক্ষিণ চালিতাবুনিয়া, সোনতলা, খুড়িয়াখালী, রায়েন্দা গ্রামের বেড়িবাঁঢ়ের বাইরে এখনো প্রায় ৮০০পরিবার জীবনের ঝুঁকি নিয়ে বসবাস করছে। এদের বেশিরভাগই নদীভাঙনে ভূমিহীন হয়ে পড়েছে। এবারের জোয়ারে সীমাহীন দুর্ভোগে পড়ে তারা। এসব পরিবারকে পুনর্বাসনের জন্য সরকারের কাছে দাবি জানাই।
খোন্তাকাটা ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান জাকির হোসেন খান মহিউদ্দিন জানান, তার ইউনিয়নের রাজৈর গ্রামটি বেড়িবাঁধের বাইর পড়েছে। এখানে প্রায় ৩০০পরিবার বাস করে। এদের মধ্যে কিছু কিছু পরিবার খুবই অসহায়। তাছাড়া, জোয়ার-ভাটার শিকার সবাই-ই। রায়েন্দা খালের পাড় থেকে বেড়িবাঁধ হলে তাদের এমন দুর্ভোগে পড়তে হতো না।
শরণখোলা উপজেলা নির্বাহী অফিসার (ইউএনও) সরদার মোস্তফা শাহিন বলেন, বেড়িবাঁধের বসবাসকারী এসব পরিবারে যার যেটুকু জমি আছে সেটুকু উচু করে দুর্যোগ সহনীয় ঘর নির্মাণের প্রস্তাবনা মন্ত্রনালয়ে পাঠানো হবে। তাছাড়া গত কয়েকদিনের অস্বাভাবিক জোয়ারে ক্ষতিগ্রস্ত পরিবাগুলোর জন্য আপাতত ১০মেট্রিকটন চাল বরাদ্দ দিয়েছে সরকার।