মহম্মদপুরে মধুমতি গিলে খাচ্ছে ১০ গ্রামের ঘরবাড়ি

চারিদিক স্পেশাল দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চল

সুকান্ত চক্রবর্ত্তী, মহম্মদপুর (মাগুরা)
মাগুরার মহম্মদপুর উপজেলার মধুমতির ভয়াবহ ভাঙনে বিলীন হচ্ছে বাড়ী-ঘর ফসলি জমি ও গাছপালা। গত কযকে বছরে অব্যাহত ভাঙনে মাগুরার মহম্মদপুর উপজেলার অন্তত ১০টি গ্রামের বড় অংশ নদীতে বিলীন হয়েছে। টিকে থাকা বাকি গ্রামগুলোও চলতি বর্ষা মৌসুমে ব্যাপক ভাঙন শুরু হয়েছে। গত কয়েক দিন ধরে ভাঙন তীব্র আকার ধারণ করছে। বিভিন্ন সময় প্রতিশ্রæতি দেওযা হলেও ভাঙন প্রতিরোধে ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে না। এমনকি পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো) ভাঙনরোধে কার্যকরে কোন পদক্ষেপ নিচ্ছে না বলে ক্ষতিগ্রস্থদের অভিযোগ।
মহম্মদপুর উপজেলার পূর্ব পাশ দিয়ে প্রবাহিত পদ্মার শাখা মধুমতির ভাঙন তীব্র আকার ধারণ করেছে। চলতি বর্ষা মৌসুমে নদী তীরবর্তী তিনটি ইউনিযনের ১০টি গ্রামের লোকজনের মধ্যে এখন বিরাজ করছে চরম আতঙ্ক। এসব এলাকায় ভাঙনে প্রতিদিনই বিলীন হচ্ছে বিভিন্ন এলাকা। গত পাঁচ দিনে নদী গ্রাস করছে দেড় হাজার একর আবাদি জমি, গাছপালা বসতভিটা মসজিদসহ কয়েকশ’ স্থাপনা। ভাঙনের মুখে পডেেছ বন্যা নিয়ন্ত্রন বাঁধ, শিক্ষা প্রতিষ্ঠানসহ অনেক স্থাপনা। আতঙ্কে অনেকেই বাড়ী-ঘর অন্যত্র সরিয়ে নিচ্ছেন ।
সোমবার (২৪ আগস্ট) সকালে মধুমতির ভাঙ্গন কবলিত এলাকা ঘুরে দেখা গেছে, উপজেলার বালিদিয়া ইউনিযনের হরেকৃষ্ণপুর, সদর ইউনিয়নের গোপালনগর,কাশিপুর,রায়পাশা, ভোলানাথপুর, পাচুড়িয়া, রুইজানী ও পলাশবাড়িয়া ইউনিয়নের ঝামা, আডমাঝি,যশোবন্তপুর গ্রামগুলো তীব্র ভাঙনের কবলে পড়েছে। এসব এলাকার নদী তীরের কয়েক’শ বসতবাড়ী ইতিমধ্যেই নদী গর্ভে বিলীন হয়ে গেছে। অসংখ্য স্থাপনা,বসতঘর, কৃষি জমি ও গাছপালা হুমকির মুখে রয়েছে। লোকজন বাড়ী ঘর অন্যত্র সরিয়ে নিচ্ছেন। অনেকে গাছপালা বিক্রি করে দিচ্ছেন। উপজেলার সবচেয়ে প্রাচীন কাশিপুর গোরস্থান থেকে ৫০ গজ দূরে মধুমতি। নদী ক্রমেই বন্যা নিয়ন্ত্রন বাঁধের দিকে এগিয়ে আসছে। ২০কিলোমিটারের বেশী দীর্ঘ এ বাঁধ ভেঙে গেলে হুমকির মুখে পড়বে উপজেলার বিস্তীর্ণ জনপদ। হরেকৃষ্ণপুর গ্রামের মধুমতি তীরবর্তী জনপদে বসতিদের মধ্যে এখন বিরাজ করছে তীব্র ভাঙন আতঙ্ক। লোকজন তাদের বসতঘরগুলো এমনভাবে নির্মাণ করছেন-যাতে দ্রæত সরিয়ে নেওয়া যায়। নদীভাঙনে কয়েকবার বসতভিটা সরিয়ে নিয়েছেন এমন পরিবারের সংখ্যা অনেক। নদীর পানি কমে যাওয়ার সাথে যোগ হয়েছে বৃষ্টি। এতে ভাঙন ক্রমেই তীব্র হচ্ছে। নদী এখন রুদ্রমূর্তি ধারণ করেছে।
ভাঙনকবলিত এলাকার ক্ষতিগ্রস্থদের সাথে কথা বলে জানা গেছে, মধুমতির ভাঙনে এসব এলাকার অনেক পরিবার এখন নিঃস্ব হয়ে পরের জমিতে আশ্রয় নিযেছেন।এদের কেউ দিনমজুর কিংবা নৌকার মাঝি। অনেকে সহায় সম্বল হারিয়ে পাড়ি জমিয়েছেন অন্যত্র। ভাঙনে ক্ষতিগ্রস্থ হয়েছেন বালিদিয়া ইউনিয়নের হরেকৃষ্ণপুর গ্রামের খবির ডাক্তার,সালেহা খাতুন,আকরাম হোসেন , ফিরোজ মিয়া,কাশিপুর গ্রামের পিকুল মোল্যা,জয়েন উদ্দিন মোল্যা, মোসলেম শেখ, পান্নু মোল্যা , রুইজানি গ্রামের প্রিয়নাথ চৌধুরী, ভোলানাথপুরের সচিন বিশ্বাস, পূর্ণ চৌধুরী ঝামা ও চর ঝামা এলাকার ইয়াসিন মোল্যা, জাহাঙ্গীর মোল্যা ও আলী আফজাল। ক্ষতিগ্রস্থ এসব মানুষেরা ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, এক সময় তারা অবস্থাপন্ন ছিলেন। গেয়াল ভরা গরু ছিল। ঘরবাড়ী, পুকুর ফসলি জমি সবই ছিল। চোখের সামনে শেষ সম্বল বাপ-দাদার ভিটে নদীতে বিলীন হওয়ার দৃশ্য তারা অসহায়ের মতো চেয়ে দেখছেন। ধুলজুড়ি গ্রামের বাসিন্দা হালাকু খাঁন বলেন, ‘মধুমতি আমাদের সব কেড়ে নিয়েছেন। আছে শুধু বসত ভিটা। এবার মনে হচ্ছে শেষ রক্ষা আর হবে না।
মহম্মদপুর উপজেলা পরিষদের মহিলা ভাইস চেয়ারম্যান বেবি নাজনীন রোববার সকালে হরেকৃষ্ণপুর এলাকায় মধুমতির নদী ভাঙনের চিত্র পরিদর্শন করেন। এসময় ভাঙনকবলিত দুর্দশাগ্রস্থ মানুষ তাকে ঘিরে ধরেন। এ সময় তিনি দ্রæত সময়ের মধ্যে কাজ শুরু হবে বলে তাদের আশ্বস্ত করেন।
মহম্মদপুর উপজেলা নির্বাহী অফিসার মিজানূর রহমান জানান, মধুমতির ভাঙন কবলিত এলাকা পরিদর্শন করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য উর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে অবহিত করা হয়েছে।
মাগুরা পানি উন্নয়ন বোর্ডের (পাউবো) নির্বাহী প্রকৌশলী সরোয়ার জাহান সুজন বলেন, গুরুত্বপূর্ন এলাকায় ভাঙনরোধে জিও ব্যাগ ফেলার জন্য বরাদ্দ পাওয়া গেছে, শীঘ্রই কাজ শুরু হবে। পানি সম্পদ মন্ত্রণালয়ে স্থায়ীভাবে মধুমতির ভাঙন প্রতিরোধে বরাদ্দ চেয়ে চিঠি পাঠিয়েছি।
মাগুরা-২ আসনের সংসদ সদস্য ড. শ্রী বীরেন শিকদার বলেন, ‘স্থায়ী ভাঙন প্রতিরোধে নদী শাসনের বেশ কিছু কাজ করা সম্পন্ন হয়েছে। শুস্ক মৌসুমে বাকী কাজ দ্রুত শুরু হবে। ক্ষতিগ্রস্থ পরিবারগুলোর মধ্যে ত্রাণ সহায়তা দিতে প্রশাসনকে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।